বিশ্বকাপের মহাযজ্ঞ এখন চূড়ান্ত পরিণতির দিকে। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ বাদ দিলে টুর্নামেন্টে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র দুটি মহারণ, আর শিরোপার লড়াইয়ে টিকে আছে মাত্র তিনটি শক্তিশালী দল। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা সেই তিন দলের অন্যতম। ২০২২ সালের সোনালী ট্রফি জয়ী এই দলটি এবারও শিরোপা ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে ফুটবল বিশ্বে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। তবে সেমিফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পৌঁছানোর পরও আর্জেন্টিনার খেলার ধরণ নিয়ে সমর্থকদের একটি বিশাল অংশ প্রকাশ করেছেন চরম অতৃপ্তি। তাঁদের মতে, মেসি-বাহিনী মাঠে সেই চেনা ছন্দে নেই। তবে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নামার আগে এই ‘খারাপ খেলা’র অপবাদ এক তুড়িতে উড়িয়ে দিয়েছেন আর্জেন্টাইন মাস্টারমাইন্ড লিওনেল স্কালোনি।
আটলান্টায় আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে স্কালোনি অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে সমালোচনার জবাব দেন। তিনি দাবি করেন, মানুষ এবং সংবাদমাধ্যম যতটা নেতিবাচকভাবে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স তুলে ধরছে, বাস্তবে তাঁর দল ততটা খারাপ খেলছে না। স্কালোনির মতে, এ পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য তাঁর দল নিশ্চয়ই কৌশলী ও সঠিক ফুটবল খেলছে, যার প্রমাণ মাঠের ফলাফল। তিনি তাঁর খেলোয়াড়দের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “এই ফুটবলাররাই আমাদের তিনটি বড় শিরোপা (২০২২ বিশ্বকাপ, ২০২১ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা) এনে দিয়েছে এবং এখন আরও একটি সেমিফাইনালে দাঁড় করিয়েছে। আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে এবং সেখানে পৌঁছাতে সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে দেব।”
এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার পথচলা ছিল বেশ নাটকীয়। গ্রুপ ‘জে’-তে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডানকে পরাজিত করে দাপটের সঙ্গে নকআউটে প্রবেশ করলেও পরের ধাপগুলো ছিল যথেষ্ট স্নায়ুক্ষয়ী। শেষ বত্রিশে কেপ ভার্দে এবং কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে জয় পেতে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত ঘাম ঝরাতে হয়েছে আর্জেন্টিনাকে। এমনকি শেষ ষোলোর ম্যাচে মিসরের বিপক্ষে ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকে এক অবিশ্বাস্য ‘কামব্যাক’ বা প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছে তারা। মূলত বড় দলগুলোর বিপক্ষে এমন ধুঁকতে থাকা পারফরম্যান্সই সমর্থকদের মনে সংশয় জাগিয়েছিল। তবে স্কালোনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দেড় মাস আগে যদি তাঁকে যেকোনো উপায়ে সেমিফাইনালে ওঠার প্রস্তাব দেওয়া হতো, তবে তিনি সেটি লুফে নিতেন। অর্থাৎ, নান্দনিক ফুটবলের চেয়ে ফলাফলকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন এই কোচ।
আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার দ্বৈরথ মানেই মাঠের লড়াই ছাপিয়ে সামনে চলে আসে রাজনৈতিক ইতিহাস। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের বিরোধ নিয়ে দুই দেশের ঐতিহাসিক তিক্ততা ফুটবল মাঠেও বারুদ ছড়ায়। তবে স্কালোনি এ বিষয়ে অত্যন্ত পরিণত মন্তব্য করেছেন। তিনি এই ফুটবল ম্যাচকে রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে মেলাতে নারাজ। তাঁর ভাষায়, “বাস্তবতা হলো এটি একটি ফুটবল ম্যাচ মাত্র। রাজনৈতিক ঘটনাগুলো আমাদের ইতিহাসের অত্যন্ত দুঃখজনক অধ্যায় ছিল, তবে এখন এই মুহূর্তে সেখানে আমাদের কিছু করার নেই।”
আজ রাত ১টায় আটলান্টায় ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সমর্থক এখন তাঁদের স্মার্টফোন ও টেলিভিশনের পর্দায় তাকিয়ে আছেন দেখার জন্য—মেসি কি পারবেন ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ চিরে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করতে, নাকি সমালোচকদের আশঙ্কাই সত্যি হবে? তবে স্কালোনির রণকৌশল ও আত্মবিশ্বাস অন্তত আলবিসেলেস্তে শিবিরে এক অদম্য মানসিকতার সংকেত দিচ্ছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।