বিশ্বকাপের মঞ্চে ফুটবলপ্রেমীরা এক মহাকাব্যিক সেমিফাইনালের সাক্ষী হলো, যেখানে ফরাসিদের দর্প চূর্ণ করে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে স্পেন। মাঠের লড়াইয়ে আধিপত্য বিস্তারের পাশাপাশি পরিসংখ্যানের পাতায় একগুচ্ছ নতুন রেকর্ড নিজেদের করে নিয়েছে ‘লা রোজা’রা। ২-০ গোলের এই জয় কেবল স্পেনের শক্তিমত্তারই পরিচয় দেয় না, বরং আধুনিক ফুটবলে তাদের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রাকেই প্রতিষ্ঠিত করে। ইতিহাসের পাতায় স্পেনের এই কীর্তি এবং ফ্রান্সের একরাশ হতাশা নিয়ে তৈরি হয়েছে রোমাঞ্চকর সব সমীকরণ।
স্পেন বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে এক আসরে টানা ৬ ম্যাচে ‘ক্লিন শিট’ বা কোনো গোল হজম না করার অভাবনীয় কীর্তি গড়েছে। ২০১০ সালের পর এটি তাদের দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা। বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন হিসেবে এবার যদি স্পেন বিশ্বকাপ জিততে পারে, তবে তারা হবে ফুটবল ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় দল (স্পেন ২০১০ ও পশ্চিম জার্মানি ১৯৭৪-এর পর), যারা একই সঙ্গে ইউরো ও বিশ্বকাপের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরবে। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যেও পিছিয়ে নেই স্প্যানিশরা; মিকেল ওইয়ারসাবাল ২২ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে এই আসরে নিজের ৫ম গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। তিনি এখন দাভিদ ভিয়া ও বুত্রাগেনিওর পর স্পেনের মাত্র তৃতীয় ফুটবলার, যিনি এক আসরে ৫ বা তার বেশি গোল করার গৌরব অর্জন করলেন। এছাড়া ৫৮ মিনিটে পেদ্রো পোরোর গোলটি ছিল ঐতিহাসিক; গত ৬০ বছরের ইতিহাসে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে একাধিক গোল করা ৫ম ডিফেন্ডার হিসেবে তিনি নাম লিখিয়েছেন।
অন্যদিকে, ফ্রান্সের জন্য এই রাতটি ছিল চরম এক দুঃস্বপ্নের। স্পেনের কাছে এই হারে টানা তৃতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়েছে ফরাসিদের। এতে করে পশ্চিম জার্মানি ও ব্রাজিলের পাশে টানা তিন ফাইনাল খেলার যে বিরল রেকর্ডের সুযোগ ছিল, তা হাতছাড়া হলো তাঁদের। এমবাপ্পে-বাহিনীর টানা ৬ ম্যাচ জয়ের যে বিশ্বরেকর্ড ছিল, তাও এই ম্যাচে এসে মুখ থুবড়ে পড়ল। এমনকি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার কিলিয়ান এমবাপ্পে পুরো ম্যাচে একবারও লক্ষ্যে শট রাখতে পারেননি। তাঁর সর্বশেষ ৯টি বিশ্বকাপ ম্যাচের মধ্যে এমন ঘটনা এই প্রথম। সব মিলিয়ে স্পেনের বিপক্ষে সর্বশেষ ১১টি লড়াইয়ের মধ্যে ৮টিতেই হারল ফ্রান্স, যা তাঁদের ফুটবলের বর্তমান দৈন্যদশাকেই ফুটিয়ে তুলছে।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে স্পেনের এই ধারাবাহিকতা আক্ষরিক অর্থেই অবিশ্বাস্য। ২০০৬ সালে এই ফ্রান্সের কাছেই হারের পর থেকে নকআউট পর্বে গত ১০ ম্যাচে অপরাজিত রয়েছে তারা। এছাড়া সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ৩৭ ম্যাচে অপরাজিত থেকে ইতালির গড়া পুরুষ জাতীয় দলের বিশ্বরেকর্ডে ভাগ বসিয়েছে স্পেন। অন্যদিকে, নকআউট পর্বে ১৯৮৬ সালের পর ফ্রান্স আর কখনোই ২-০ ব্যবধানের মতো এত বড় পরাজয়ের মুখে পড়েনি। পরিসংখ্যানের এই পাহাড় ডিঙিয়ে স্পেন এখন কেবল এক ধাপ দূরে শিরোপার স্বাদ নেওয়ার জন্য, যেখানে ফরাসিদের বিদায় নিতে হলো একরাশ গ্লানি ও রেকর্ড ভাঙার হাহাকার নিয়ে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।