৯৬ বছর বয়স মানুষের জীবন সায়াহ্ন হলেও আইলিন চিন যেন এক জীবন্ত বিস্ময়। একটি জরাজীর্ণ বাদামি বাসমতি চালের ব্যাগে জিপার লাগিয়ে আগলে রেখেছেন গত শতকের কিছু হাতে লেখা হলদেটে কাগজ। এগুলো কেবল রান্নার সাধারণ কোনো রেসিপি নয়, বরং জ্যামাইকান এই প্রবীণের কাছে এটি তাঁর বংশপরম্পরার ইতিহাস ও শত বছরের পারিবারিক ঐতিহ্যের অমূল্য ভাণ্ডার। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে হাতা-খুন্তি হাতে যার রন্ধনশৈলীর পথচলা শুরু হয়েছিল, ৯৬ বছর বয়সে এসে তিনি এখন সারা বিশ্বের কাছে এক জনপ্রিয় ‘ফুড ইনফ্লুয়েন্সার’ ও ‘ডিজিটাল আইকন’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
আইলিনের এই জাদুকরী যাত্রার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ প্রেক্ষাপট। ১৯৫০-এর দশকে নিজ দেশ জ্যামাইকার ‘সেন্ট মেরি’ এলাকার হাইগেটে স্বামীর সঙ্গে একটি সফল বেকারি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। দীর্ঘ কয়েক দশক সাধারণ মানুষকে মুখরোচক খাবার পরিবেশনের পর ২০০৮ সালে বেকারিটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মায়ামিতে পরিবারের সঙ্গে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তবে দেশ ও পরিবেশ বদলে গেলেও নিজের শিকড়ের স্বাদকে তিনি কখনোই ভুলে যাননি।
পরিবারের নতুন প্রজন্মের কাছে সেই ঐতিহ্যবাহী রেসিপিগুলো পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই তিন বছর আগে তাঁর নাতি লুকাস ওংয়ের মাথায় এক অভিনব বুদ্ধি খেলে যায়। নাতির উৎসাহে আইলিন ক্যামেরার সামনে এসে তৈরি করতে শুরু করেন সেই সব কালজয়ী খাবার, যা একসময় তাঁর বেকারিকে জনপ্রিয় করেছিল। লুকাস সেই রান্নার ভিডিওগুলো ধারণ করে ‘ইউটিউব’, ‘টিকটক’ ও ‘ইনস্টাগ্রাম’-এর মতো জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করতে শুরু করেন। ব্যাস, আধুনিক এই ‘স্মার্টফোন’ ও ইন্টারনেটের যুগে মুহূর্তেই শুরু হয় আইলিন-ম্যাজিক।
কখনো নিখুঁত চকলেট চিপ কুকি, আবার কখনো জ্যামাইকার ঐতিহ্যবাহী মশলাযুক্ত সব খাবার তৈরি করে নেটিজেনদের মন জয় করে নিয়েছেন তিনি। সুস্বাদু খাবারে কামড় দিয়ে যখন তিনি তাঁর চিরচেনা জ্যামাইকান কথ্য ভাষায় ‘মি রাহটিড!’ (Me rahtid!) অর্থাৎ ‘আহা, দারুণ!’ বলেন, তখন পর্দার ওপারে থাকা লাখো দর্শকের মুখে হাসি ফোটে। বর্তমানে সব প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে এই দাদি-নাতি জুটির ভক্তের সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
তবে কেবল লাইক আর কমেন্টেই সীমাবদ্ধ থাকেনি তাঁর সাফল্য। ৯৬ বছর ৮৯ দিন বয়সে আইলিন চিন গড়েছেন এক অবিশ্বাস্য মাইলফলক। বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক জীবিত নারী ‘ফুড ইউটিউবার’ হিসেবে তাঁর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে মর্যাদাপূর্ণ ‘গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’-এর পাতায়। এই বিরল সম্মাননা অর্জনের পর এক আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় আইলিন বলেন, “পরবর্তী প্রজন্মের কাছে রান্নার এই আদি জ্ঞান পৌঁছে দিতে পারাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ‘অ্যাচিভমেন্ট’ বা প্রাপ্তি। মানুষ যখন আমার পারিবারিক রেসিপিগুলো দেখে আনন্দ পায়, তখন আমার সার্থকতা খুঁজে পাই।” তাঁর এই জয়যাত্রা প্রমাণ করে যে, সৃজনশীলতা আর সাহসের কাছে বয়স কেবল একটি সংখ্যা মাত্র।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।