হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের ৩ শর্ত: বিশ্ববাণিজ্যে কি ফিরবে স্বস্তি?

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সর্বাত্মক যুদ্ধের জেরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন—হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অচল হয়ে রয়েছে। এই অচলাবস্থা কাটিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অতি সংবেদনশীল এই আন্তর্জাতিক জলপথ পুনরায় উন্মুক্ত করতে এবার সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বেশ কিছু কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছে ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এই চাঞ্চল্যকর কূটনৈতিক অগ্রগতির তথ্য নিশ্চিত করেছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম বার্ষিক অধিবেশনে যোগদানের উদ্দেশ্যে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। সম্মেলনের ফাঁকে গতকাল মঙ্গলবার সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন তিনি। ইরানি রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের একান্তে অনুষ্ঠিত এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরানের সুনির্দিষ্ট শর্তগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়াশিংটনের বিশেষ দূতের টেবিলে তুলে ধরেন আরাগচি।

ইরানের পক্ষ থেকে উত্থাপিত এই প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—মধ্যপ্রাচ্যের সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর চাপিয়ে দেওয়া একতরফা নৌ অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে, আন্তর্জাতিকভাবে জব্দ বা স্থগিত করে রাখা ইরানের যাবতীয় আর্থিক সম্পদ কোনো বিলম্ব ছাড়াই অবমুক্ত করতে হবে এবং গাজা, লেবাননসহ পুরো অঞ্চলের সব কটি ‘প্রতিরোধ ফ্রন্টে’ চলমান সামরিক সংঘাত ও যুদ্ধের চূড়ান্ত অবসান ঘটাতে হবে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সার্বভৌম ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার মধ্য দিয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে। ওই হামলার পরপরই পাল্টা কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বৈশ্বিক তেলের প্রধান ধমনি হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয় তেহরান। অথচ এই সংঘাত শুরু হওয়ার আগে বিশ্বের মোট উৎপাদিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) পাঁচ ভাগের এক ভাগই এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্ববাজারে সরবরাহ করা হতো।

পরবর্তীতে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার জবাবে ইরান অভিমুখী এবং দেশটির বিভিন্ন সমুদ্রবন্দর থেকে ছেড়ে আসা সব ধরনের জাহাজের চলাচল ও বন্দরগুলোর ওপর কঠোর নৌ অবরোধ আরোপ করে মার্কিন সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরান ছাড়া অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের বন্দরগুলোতে বাণিজ্যিক নৌযানগুলোর অবাধ যাতায়াত ও নৌ চলাচলের স্বাধীনতা তারা নিশ্চিত করবে। তবে বাস্তবে যুদ্ধের তীব্রতা ও ক্ষেপণাস্ত্রের ঝুঁকির কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিয়মিত জ্বালানি ও পণ্যবাহী বাণিজ্যিক জাহাজের গমনাগমন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। এর প্রত্যক্ষ ও বিধ্বংসী প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারে; জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়ে পড়ায় চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে বিশ্বের বহু দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি।