ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে বন্যা পরিস্থিতি এক ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় রাজ্যে বন্যাজনিত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় নতুন করে ২১ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই নিয়ে চলতি বছরের বন্যায় সরকারি হিসেবে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ জনে। অতিবৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তোড়ে রাজ্যের ১৬টি জেলার ৫ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি মানুষ বর্তমানে চরম মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও পানিবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
আসাম রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এএসডিএমএ) মঙ্গলবার (২১ জুলাই) গভীর রাতে এক বিশেষ ‘বুলেটিন’ প্রকাশ করে এই ক্ষয়ক্ষতির তথ্য নিশ্চিত করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত একদিনে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে শিবসাগর জেলায়, যেখানে ১৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া চরাইদেও জেলায় পাঁচজন, গোলাঘাটে দুজন এবং জোরহাটে একজনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। মাত্র একদিনের ব্যবধানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৩ লাখ ৬৩ হাজার থেকে একলাফে ৫ লাখ ৬৬ হাজারে পৌঁছানোয় পরিস্থিতি কতটা ‘ক্রিটিক্যাল’ বা নাজুক তা সহজেই অনুমেয়।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, উজানের ‘ক্লাউডবার্স্ট’ বা মেঘভাঙা বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট এই আকস্মিক বন্যায় মানুষ অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে তিনি আজ বুধবার থেকে চরাইদেও, শিবসাগর ও জোরহাটসহ বন্যাকবলিত এলাকা ও ত্রাণশিবিরগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বর্তমানে ৪৪টি রাজস্ব সার্কেলের আওতায় ৮৭২টি গ্রাম সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে শিবসাগর জেলাটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষ বর্তমানে বাস্তুচ্যুত।
পাহাড়ি ঢলের তীব্রতায় ব্রহ্মপুত্র, দিখৌ, দিসাং, বুড়িডিহিং ও দক্ষিণ ধানসিরি নদীর পানি বিভিন্ন পয়েন্টে বিপৎসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রবল পানির চাপে রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ে (এনএফআর) কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছে। বিশেষ করে শিবসাগর জেলার শিমালুগুড়ি-নামতিয়ালি ও শিমালুগুড়ি-সেলেংহাট রুটে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। যাত্রীদের সুবিধার্থে কিছু ট্রেনের রুট পরিবর্তন এবং জরুরি প্রয়োজনে বিশেষ ট্রেন চালুর একটি ‘প্যাকেজ’ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।
দুর্যোগপূর্ণ এই সময়ে বন্যাকবলিত এলাকায় মানুষের জীবন বাঁচাতে ও তথ্য আদান-প্রদান সচল রাখতে ভারতের টেলিযোগাযোগ বিভাগ একটি বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। শিবসাগর, চরাইদেও ও জোরহাট জেলায় আগামী ২৪ জুলাই পর্যন্ত ‘ইন্ট্রা-সার্কেল রোমিং’ সুবিধা চালু করা হয়েছে। এর ফলে ব্যবহারকারীরা তাঁদের ‘স্মার্টফোন’-এ নিজস্ব অপারেটরের নেটওয়ার্ক না থাকলেও অন্য যেকোনো সচল অপারেটরের টাওয়ার ব্যবহার করে জরুরি যোগাযোগ রক্ষা করতে পারবেন। বর্তমানে ৭১টি ত্রাণশিবিরে ১২ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০২টি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র সক্রিয় রাখা হয়েছে। তবে বৃষ্টির দাপট না কমলে আসামের এই মানবিক বিপর্যয় আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।