বৈশ্বিক অর্থনীতির স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ালস্ট্রিটে এক বড় ধরনের পটপরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত ১৬ বছরের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে নিজেদের পুঁজি সরিয়ে নিচ্ছেন মার্কিন বিনিয়োগকারীরা। বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফায় অনিশ্চয়তা এবং বিদেশের শেয়ারবাজারগুলো অধিক লাভজনক হয়ে ওঠায় বিনিয়োগের এই প্রবাহ এখন আন্তর্জাতিক বাজারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এলএসইজি/লিপারের (LSEG/Lipper) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ছয় মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত বিনিয়োগকারীরা তাদের নিজস্ব ‘ইকুইটি’ বা শেয়ারভিত্তিক বিনিয়োগ থেকে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলার তুলে নিয়েছেন। এর মধ্যে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, শুধু চলতি ২০২৬ সালের শুরু থেকেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে ৫ হাজার ২০০ কোটি ডলার। ২০১০ সালের পর বছরের প্রথম আট সপ্তাহে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের এই হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গৃহীত বিভিন্ন নীতিমালার প্রভাবে গত জানুয়ারি থেকে বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে ডলার প্রায় ১০ শতাংশ দুর্বল হয়েছে। সাধারণত ডলার দুর্বল হলে বিদেশী সম্পদ কেনা মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে পড়ার কথা; কিন্তু বর্তমানে বিদেশের বাজারে মুনাফার হার এতই বেশি যে সেই বাধা তুচ্ছ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছর থেকেই মার্কিন সম্পদ থেকে সরে এসে পোর্টফোলিওতে বৈচিত্র্য আনার যে প্রবণতা শুরু হয়েছিল, তা এখন স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও প্রবল রূপ নিয়েছে।
২০০৯ সালের বৈশ্বিক মন্দার পরবর্তী দীর্ঘ সময় ধরে শক্তিশালী অর্থনীতি এবং প্রযুক্তি খাতের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে ‘বাই আমেরিকা’ বা মার্কিন সম্পদ কেনার জোয়ার ছিল। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ (AI) প্রযুক্তির জয়জয়কার গত বছর এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচককে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে এনভিডিয়া, মেটা কিংবা মাইক্রোসফটের মতো এআই জায়ান্টগুলোর শেয়ারদরের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি এবং উচ্চমূল্যায়নের ঝুঁকি বিনিয়োগকারীদের ভাবিয়ে তুলেছে। ফলে তারা এখন জার্মানি, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড বা জাপানের মতো দেশের প্রথাগত ও নিরাপদ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে ঝুঁকছেন।
ব্যাংক অব আমেরিকার ফেব্রুয়ারি মাসের ‘ফান্ড ম্যানেজার সার্ভে’ বলছে, গত পাঁচ বছরের মধ্যে বিনিয়োগকারীরা এখন সবচেয়ে বেশি দ্রুতগতিতে মার্কিন ইকুইটি থেকে উদীয়মান বাজারের (Emerging Markets) দিকে ছুটছেন। ইউবিএসের (UBS) ইউরোপিয়ান ইকুইটি অ্যান্ড গ্লোবাল ডেরিভেটিভস স্ট্র্যাটেজি বিভাগের প্রধান জেরি ফাউলার বলেন, ‘এ বছর আমাদের ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট ব্যবসার অনেকের সঙ্গেই আলোচনা হয়েছে। তারা সবাই এখন বিদেশের বাজারে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন।’
পরিসংখ্যান বলছে, মার্কিন বিনিয়োগকারীরা চলতি বছর উদীয়মান বাজারের শেয়ারে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছেন। এর মধ্যে একক দেশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ায় সর্বোচ্চ ২৮০ কোটি ডলার এবং ব্রাজিলে ১২০ কোটি ডলার বিনিয়োগ গিয়েছে। রিটার্নের হারের দিকে তাকালে দেখা যায়, গত ১২ মাসে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক যেখানে ১৪ শতাংশ বেড়েছে, সেখানে ডলারের হিসেবে জাপানের নিক্কেই সূচক বেড়েছে ৪৩ শতাংশ এবং ইউরোপের স্টক্স ৬০০ বেড়েছে ২৬ শতাংশ। এমনকি সাংহাইয়ের সিএসআই ৩০০ সূচক থেকে ২৩ শতাংশ রিটার্ন এসেছে এবং সিউলের কেওএসপিআই সূচকের মান প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
বর্তমানে ওয়ালস্ট্রিটের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ার প্রত্যাশিত আয়ের প্রায় ২১ দশমিক ৮ গুণ দামে কেনাবেচা হচ্ছে, যা অত্যন্ত চড়া। বিপরীতে ইউরোপীয় বাজারে এই হার ১৫ গুণ এবং চীন ও জাপানে যথাক্রমে ১৩ দশমিক ৫ ও ১৭ গুণ। অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান কারমিগনাকের পোর্টফোলিও উপদেষ্টা কেভিন থোজেট জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই ইউরোপের বাজারে মার্কিন পুঁজির এই প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সব মিলিয়ে, এক সময়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ওয়ালস্ট্রিট এখন তার নিজের দেশের বিনিয়োগকারীদের কাছেই আকর্ষণ হারাচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্রে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।