আইন, মজুরি নাকি লিজ-ঠিক কোথায় আটকে আছে চামড়া শিল্পনগরীর ভবিষ্যৎ?

ঢাকার অদূরে সাভারে অবস্থিত দেশের সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্পনগরীর দেখভালের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকছে, তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে এক চরম অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) হাত থেকে এর নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) কাছে হস্তান্তরের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা বর্তমানে এক জটিল আইনি ও কাঠামোগত গোলকধাঁধায় আটকে আছে। ২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেও, মালিক-শ্রমিকদের আপত্তি, আইনি ভিন্নতা এবং কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে পুরো বিষয়টি এখন কার্যত ‘ঝুলন্ত অবস্থায়’ রয়েছে।


রাজধানীর প্রাণ বুড়িগঙ্গা নদী এবং ঢাকার সার্বিক পরিবেশদূষণ রোধের লক্ষ্যে ২০১৭ সালে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে হাজারীবাগ থেকে চামড়া পরিশোধন কারখানা বা ট্যানারিগুলো সাভারের আধুনিক চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তর করা হয়। শুরু থেকেই এই সুবিশাল শিল্পনগরের পরিচালনার সার্বিক দায়িত্বে রয়েছে বিসিক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, স্থান পরিবর্তন হলেও ট্যানারির বিষাক্ত বর্জ্যের ভয়াবহ পরিবেশদূষণ থামানো সম্ভব হয়নি। এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি (CETP) ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতাকে।


পাশাপাশি, শিল্পনগরের কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকটিও মারাত্মকভাবে অবহেলিত। আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স বা মানদণ্ড বজায় রাখতে না পারায় দূষণের কারণে বিশ্ববাজারে কাঙ্ক্ষিত ভালো দামে চামড়া বিক্রি করতে চরম ব্যর্থ হচ্ছেন দেশীয় রপ্তানিকারকেরা। ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই এই হতাশাজনক পরিস্থিতির জন্য বিসিকের অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা এবং তদারকির অভাবকে সরাসরি দায়ী করে আসছেন।


সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে চামড়া শিল্পনগরীর সিইটিপি সংস্কারে বেশ কয়েকবার তোড়জোড় করা হয়েছিল। এমনকি একপর্যায়ে ‘চামড়াশিল্প উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ নামে নতুন একটি কাঠামো গঠনের চিন্তাও করেছিল তৎকালীন সরকার। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কোনো উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। এরপর ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এলে, ব্যবসায়ীরা চামড়া শিল্পনগরীর অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে সংকট নিরসনের বিষয়টি নতুন করে সামনে আনেন। তাঁদের জোরালো দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই চামড়া শিল্পনগরীর সম্পূর্ণ দায়িত্ব বিসিকের কাছ থেকে প্রত্যাহার করে বেপজার অধীন ন্যস্ত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকার।


বেপজাকে কেন বেছে নেওয়া হয়েছিল? শিল্প মন্ত্রণালয়, বিসিক ও বেপজার একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, বিসিকসহ দেশের ছয়টি বড় বিনিয়োগ সংস্থাকে একীভূত করার লক্ষ্যে সাবেক শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমানকে আহ্বায়ক করে ২০২৫ সালের এপ্রিলে আট সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে সরকার। ওই কমিটির প্রথম আনুষ্ঠানিক সভাতেই চামড়া শিল্পনগরীকে বেপজার ছাতার নিচে নিয়ে আসার নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। এর পেছনে মূল যুক্তি ছিল—ঢাকা, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের ইপিজেডে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সিইটিপি পরিচালনার দারুণ ট্র্যাক রেকর্ড ও কারিগরি অভিজ্ঞতা রয়েছে বেপজার।


কর্তৃপক্ষ বদলের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কীভাবে সম্পন্ন হবে, তার রূপরেখা প্রণয়নের জন্য ওই সময়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) নজরুল ইসলামকে প্রধান করে একটি বিশেষ কমিটিও গঠন করে সরকার। গত এক বছরে এই কমিটির উদ্যোগে বেশ কয়েকটি আন্তসংস্থা ও অংশীজন সভা অনুষ্ঠিত হয়। পর্যালোচনার পর কমিটি শিল্প মন্ত্রণালয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট সুপারিশ জমা দেয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের মেয়াদে এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো ডেডলাইন বা সিদ্ধান্ত টেনে যেতে পারেনি। গত ফেব্রুয়ারিতে গঠিত নতুন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই স্পর্শকাতর বিষয়টি এখন পুনরায় গভীর মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।


শিল্পসচিব মো. ওবায়দুর রহমান এ বিষয়ে প্রথম আলোকে জানান, ‘এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অনেক বিষয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। এগুলো পরিষ্কার হলে সবকিছু মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ যদি একীভূত হয়, তবে নতুন আইনি কাঠামোর অধীনে এটিকে ‘বিশেষ ইপিজেড’ হিসেবে ঘোষণা করা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।


জটিলতার মূল কেন্দ্রবিন্দু কোথায়? সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চামড়া শিল্পনগরীকে বেপজার অধীন নেওয়ার ক্ষেত্রে পাহাড়সম বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ বিরাজমান। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুই সংস্থার আইনি ভিন্নতা। বর্তমানে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীটি দেশের প্রচলিত সাধারণ শ্রম আইনে পরিচালিত হয়। কিন্তু বেপজার নিজস্ব ও সম্পূর্ণ আলাদা একটি শ্রম আইন রয়েছে। কারখানাগুলো বেপজার অধীন গেলে স্বভাবতই শ্রমিকদের বেতনের কাঠামো ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বহুগুণ বেড়ে যাবে। আন্তর্জাতিক বাজারে ধুঁকতে থাকা ট্যানারি উদ্যোক্তারা রাতারাতি এই বিশাল বাড়তি ব্যয়ভার বহন করার সক্ষমতা রাখেন কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।


দ্বিতীয় বড় সংকট হলো জমির লিজ বা ইজারা পদ্ধতি। বিসিকের কাছ থেকে অধিকাংশ ট্যানারিমালিক ইতিমধ্যেই ৯৯ বছরের জন্য জমি ইজারা নিয়েছেন। অন্যদিকে, বেপজার জমি বরাদ্দের পলিসি সম্পূর্ণ আলাদা। তৃতীয়ত, বেপজা মূলত শতভাগ রপ্তানিমুখী (Export-oriented) শিল্পকারখানা নিয়ে কাজ করে। কিন্তু সাভারের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ট্যানারি শুধু দেশীয় বা স্থানীয় বাজারের জন্যই পণ্য উৎপাদন করে থাকে। বেপজার হাতে নিয়ন্ত্রণ গেলে এই বিপুলসংখ্যক লোকাল কারখানার ভবিষ্যৎ কী হবে, তার কোনো স্পষ্ট রূপরেখা এখনো কেউ দিতে পারেনি।


বিসিকের চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ বদল নিয়ে সরকারের গঠিত কমিটি সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে এসব বিষয়ে পরামর্শ দেবে। এরপর সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।’


মালিক ও শ্রমিক পক্ষের মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ বর্তমানে সাভারের চামড়াশিল্প নগরীতে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৩০টি কারখানা সরাসরি উৎপাদনে রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বৃহৎ কারখানার মালিক জানিয়েছেন, তাঁরা এই আকস্মিক কর্তৃপক্ষ বদলের বিষয়টি নিয়ে চরম ধোঁয়াশা ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। জমি ইজারা, কাঁচামালের শুল্কায়ন, এবং বিশেষ করে শ্রমিকের বর্ধিত মজুরির ইস্যুগুলো তাঁদের কপালে ভাঁজ ফেলেছে।


বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সালমা ট্যানারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘আমরা বেপজার অধীন যাওয়ার জন্য রাজি, তবে কিছু বিষয়ে আগে পরিষ্কার হতে হবে। তার আগে স্থানান্তর চাই না।’ তবে বেপজার উন্নত ব্যবস্থাপনায় সিইটিপি পরিচালনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিশ্বমানের হবে বলে তিনি আশাবাদী। তিনি আরও যোগ করেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের জানানো হয়েছে যে কর্তৃপক্ষ বদল হলেও পুরোপুরি বেপজার আইনে না চলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইন শিথিল করা হবে। বেপজার বিশেষ চামড়া শিল্পনগরী নামে নতুন আইনে এটি হতে পারে। এ ছাড়া শ্রমিক ইউনিয়নের মতো বিষয়ে জোর করে কিছু চাপিয়ে দেওয়া হবে না।’


অন্যদিকে, এই সিদ্ধান্তের কড়া বিরোধিতা করেছেন শ্রমিকনেতারা। ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ মনে করেন, বেপজার অধীনে গেলে শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত অধিকার চরমভাবে খর্ব হবে। তিনি বলেন, ‘ট্যানারিশিল্প দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত খাত। এখানে ৫০ থেকে ৬০ বছরের পরীক্ষিত শ্রমিক ইউনিয়ন রয়েছে। তেমন কোনো শ্রম অসন্তোষের ঘটনা নেই। এ অবস্থায় বেপজার অধীন গেলে শ্রম অধিকারের কী হবে? সরকারের কাছে ইতিমধ্যে বিষয়টি জানিয়েছি, আবারও বলব। সার্বিকভাবে আমরা এটিকে সঠিক সিদ্ধান্ত মনে করি না।’


তাঁর মতে, সরকার ও মালিকপক্ষের ভুল নীতির মাশুল দিচ্ছেন সাধারণ শ্রমিকেরা। হাজারীবাগ থেকে স্থানান্তরের সময় অনেক ছোট ব্যবসায়ী ও শ্রমিক পথে বসেছেন। নতুন করে বেপজার কঠোর নীতিমালার গ্যাঁড়াকলে পড়ে অনেক ছোট কারখানা অস্তিত্বের সংকটে পড়তে পারে, যা ভয়াবহ চাকরিচ্যুতির ঝুঁকি তৈরি করবে।


বেপজার অনীহা এবং বর্তমান সরকারের অবস্থান আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, দেশের অন্যতম বৃহৎ এই শিল্পনগরীকে নিজেদের অধীনে নিতে খোদ বেপজাও খুব একটা আগ্রহী নয়। সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের দাবি, এই বিশাল দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়ার আগে তাঁদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মতামত নেওয়া হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেপজার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘এ বিষয়ে বেশ কিছু কারিগরি (টেকনিক্যাল) ইস্যু রয়েছে। যদি বেপজাকে দেওয়া হয়, তাহলে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। ইপিজেডের অধীন কারখানায় শ্রমিকেরা বাইরের কারখানা থেকে বেশি মজুরি পান। ফলে এই বাড়তি বেতন মালিকেরা শ্রমিকদের দিতে পারবেন কি না, সেটি আগে আলাপ করতে হবে।’


গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া বড় সিদ্ধান্তগুলো নতুন করে পুনর্মূল্যায়ন বা রিভিউ করা হচ্ছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চামড়া শিল্পনগরীর এই ইস্যুটি নিয়ে ইতিমধ্যেই দুটি উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো নির্দেশনা আসেনি।


প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, চামড়া শিল্পনগরী হস্তান্তরের কারিগরি ও আইনি জটিলতাগুলো বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। এই জটিলতাগুলোর একটি সন্তোষজনক ফয়সালার ওপরই পুরো খাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।


সার্বিক বিষয়ে চামড়া শিল্পনগরীর কর্তৃপক্ষ বদলসংক্রান্ত গঠিত কমিটির প্রধান ও বেজার সদস্য মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকলেও কর্তৃপক্ষ বদলের প্রক্রিয়াটি এখনো শুরু হয়নি। কারণ, এর চেয়েও ফলপ্রসূ কোনো বিকল্প আছে কি না, তা নিয়ে অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি।’


তিনি আরও জানান, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সম্ভাব্য অংশীদারের সঙ্গে নিবিড় আলোচনা চলছে। সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল এ বিষয়ে আলোচনা করেছে এবং তারা ইতিমধ্যে প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শনও করেছে। মো. নজরুল ইসলামের ভাষ্যমতে, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য হলো দূষণ নিয়ে চামড়া খাতে যে সংকট রয়েছে, তার থেকে স্থায়ী পরিত্রাণ পাওয়া। এটি কি শেষ পর্যন্ত বেপজার অধীনে যাবে, নাকি কোনো বিদেশি বিনিয়োগ সংস্থা এখানে সরাসরি যুক্ত হবে, তা নানা বিষয় পর্যালোচনার পরে নির্ধারিত হবে।’


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।