আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে এক নজিরবিহীন ‘অস্বাভাবিক’ লেনদেনের চিত্র ফুটে উঠেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক ইরান সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণী ঘোষণা আসার ঠিক আগমুহূর্তে তেলের বাজারে প্রায় ৭ বিলিয়ন (৭০০ কোটি) ডলারের সন্দেহজনক লেনদেন হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে বর্তমানে মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে শুরু হয়েছে তোলপাড়। কোনো ধরনের ‘ইনসাইডার’ বা গোপন তথ্য ব্যবহার করে এই বিশাল অঙ্কের মুনাফা করা হয়েছে কি-না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্তে নেমেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
রয়টার্সের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে চারটি পৃথক দিনে তেল ও জ্বালানি ‘ফিউচার্স’ মার্কেটে বড় ধরনের ‘শর্ট পজিশন’ নেয়া হয়েছিল। ফিউচার্স মার্কেটের ভাষায় ‘শর্ট পজিশন’ হলো এমন একটি কৌশল, যেখানে বিনিয়োগকারী আগেভাগে পণ্য বিক্রি করেন এই আশায় যে ভবিষ্যতে এর দাম কমবে। পরবর্তীতে দাম কমলে তিনি কম দামে ওই পণ্য বা চুক্তি কিনে ট্রেড বন্ধ করে বড় অঙ্কের মুনাফা তুলে নেন।
এই রহস্যময় লেনদেনের প্রথম ও সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটে ২৩ মার্চ। সেদিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় সম্ভাব্য হামলা বিলম্বিত করার ঘোষণা দেন। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই ঘোষণা আসার মাত্র কয়েক মিনিট আগে প্রায় ২২০ কোটি ডলারের তেল, ডিজেল ও গ্যাসোলিন ফিউচার্সে শর্ট পজিশন নেয়া হয়। ট্রাম্পের ঘোষণার পরপরই বাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়, যার ফলে ওই বিনিয়োগকারীরা মুহূর্তেই বিপুল মুনাফা অর্জন করেন। বিশ্ববিখ্যাত ফিউচার্স এক্সচেঞ্জ আইসিই (ICE) ও সিএমই (CME) গ্রুপে এই অস্বাভাবিক লেনদেনগুলো পরিলক্ষিত হয়েছে।
এরপর ৭ এপ্রিল ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার ঠিক আগে বাজারে ২১০ কোটি ডলারের শর্ট পজিশন নেয়া হয়। ১৭ এপ্রিল যখন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনার কিছুটা নমনীয় ইঙ্গিত দেন, তার আগেও প্রায় ২০০ কোটি ডলারের লেনদেন হয়। সর্বশেষ ২১ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির বার্তার আগেও ৮৩ কোটি ডলারের ট্রেড সম্পন্ন হয়। অর্থাৎ, প্রতিটি রাজনৈতিক বার্তার ঠিক আগেই বাজারের গতিপ্রকৃতি বদলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
জ্বালানি বাজার বিশেষজ্ঞ আদি ইমসিরোভিচ এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত অস্বাভাবিক বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, বাজারের এমন নিখুঁত টাইমিং ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো হয়তো নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের আগাম খবরের নাগাল পেয়েছিল। নিউইয়র্কভিত্তিক আইনজীবী রবার্ট ফ্রেঞ্চম্যান জানিয়েছেন, লেনদেনের এই অস্বাভাবিক বিশাল অঙ্ক নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরে আসতে বাধ্য।
বর্তমানে মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা কমোডিটি ফিউচার্স ট্রেডিং কমিশন (সিএফটিসি) পুরো বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। প্রাথমিক তদন্তে ২৬০ কোটি ডলারের লেনদেন নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলেও পরবর্তীতে দেখা যায়, বিভিন্ন জ্বালানি পণ্যে এই কারসাজির পরিমাণ প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। মার্কিন বিচার বিভাগ (ডিওজে) এই ঘটনার পেছনে কোনো প্রভাবশালী চক্র বা সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশ আছে কি-না, তা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে। যদিও হোয়াইট হাউজ থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, সরকারি গোপন তথ্য ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধার জন্য ব্যবহার করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা কুশীলবরা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরের নাকি বিদেশের, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।