বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে ইরানকে কোণঠাসা করতে মার্কিন নৌবাহিনীর কঠোর ‘ব্লকেড’ বা অবরোধের মুখে পড়েছে তেহরান। হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির কারণে ইরানের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি খাত এখন নজিরবিহীন সংকটের সম্মুখীন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘নিক্কেই এশিয়া’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন এই অবরোধের ফলে প্রতিদিন প্রায় ১৮ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উৎপাদিত বাড়তি তেল জমা রাখার জায়গা খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে দেশটি।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, গত ১৩ এপ্রিল মার্কিন সামরিক বাহিনী এই বিশেষ অবরোধ কার্যক্রম শুরু করার পর থেকে এশিয়ার বাজারগুলোতে ইরানের তেলের প্রবেশাধিকার প্রায় রুদ্ধ হয়ে গেছে। ইউরোপীয় তথ্য সরবরাহকারী সংস্থা ‘কেপলার’-এর পরিসংখ্যান বলছে, এই অবরোধ শুরু হওয়ার আগে ইরান দৈনিক গড়ে ২২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেল রফতানি করত। তবে বর্তমানে সেই পরিমাণ নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়ে মাত্র ১৩ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেলে নেমে এসেছে। যদিও যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই গত মার্চ মাস থেকে ইরান গড়ে দৈনিক ১৮ লাখ ব্যারেল তেল রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছিল, কিন্তু মার্কিন কড়াকড়ির কারণে এই বিপুল পরিমাণ তেল গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই মাঝপথে আটকে যাচ্ছে।
জাহাজ চলাচলের তথ্য পর্যালোচনাকারী সাইট ‘মেরিনট্র্যাফিক’-এর তথ্যানুযায়ী, এই সংকট মোকাবিলায় ইরান এক অভিনব ও ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করেছে। দেশটি তাদের পুরনো ও পরিত্যক্ত বিশালাকার তেলের ট্যাংকারগুলোকে পুনরায় সচল করে সেগুলোকে ‘ভাসমান গুদাম’ হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের খার্গ দ্বীপের কাছে ৩০ বছরের বেশি পুরনো বিশালাকার ট্যাংকারগুলোতে উৎপাদিত তেল জমিয়ে রাখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক তদারকি ও নজরদারি এড়াতে এসব জাহাজ থেকে প্রয়োজনীয় ট্র্যাকিং সংকেত বা সিগন্যাল পাঠানোও বন্ধ করে দিয়েছে ইরানি কর্তৃপক্ষ।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান চাইলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের তেলের কূপগুলো বন্ধ করতে পারছে না। কারণ একবার উৎপাদন বন্ধ করে দিলে ভূগর্ভস্থ চাপের পরিবর্তনের ফলে তেলের খনিগুলো স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা পুনরায় চালু করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করতে না পারলেও উৎপাদন সচল রাখতে বাধ্য হচ্ছে তেহরান। অন্যদিকে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরান-পাকিস্তান সীমান্ত থেকে ওমান পর্যন্ত একটি দুর্ভেদ্য ‘অবরোধ রেখা’ তৈরি করেছে। এর ফলে গত কয়েক সপ্তাহে অন্তত ৪৫টি বাণিজ্যিক জাহাজকে পণ্য খালাস করতে না দিয়ে মাঝপথ থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ইরানের বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় ৬০ শতাংশ আয় আসে জ্বালানি তেল রফতানি থেকে, যার একটি বড় অংশই ক্রয় করে চীন। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এই রফতানি যদি পুরোপুরি স্থবির হয়ে যায়, তবে ইরানের প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৭ কোটি ডলার লোকসান হতে পারে। যদিও ইরান বিকল্প পথ হিসেবে আফগানিস্তানের মাধ্যমে রেলপথে জ্বালানি তেল পাঠানোর চেষ্টা চালাচ্ছে, তবে রফতানি চাহিদার তুলনায় তা একেবারেই নগণ্য। এই দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপ ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।