দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বৈশ্বিক তেল উৎপাদনকারী জোট ওপেক (OPEC) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে গেল সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। এই ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও, এই পদক্ষেপকে রীতিমতো স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, আমিরাতের এই প্রস্থানের ফলে বিশ্ববাজারে ওপেকের একক মূল্য নির্ধারণের একচেটিয়া ক্ষমতা অনেকটাই খর্ব হবে, যার সরাসরি সুফল ভোগ করবে ওয়াশিংটন।
আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত বহুদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মহলের রাডারে থাকলেও, ঘোষণার টাইমিং বা সময়টি ছিল বেশ অপ্রত্যাশিত। এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি’-এর অ্যাডজাংক্ট সিনিয়র ফেলো র্যাচেল জিয়েম্বা একটি গভীর পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘সময়ের দিক থেকে এই সিদ্ধান্ত কিছুটা বিস্ময়কর হলেও এই প্রেক্ষাপট অনেক দিন ধরেই তৈরি হচ্ছিল।’ তিনি আরও একটি বড় প্রশ্নের অবতারণা করেছেন—এই ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যে ভবিষ্যতে সহযোগিতার বদলে দেশগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হবে কি না এবং বিশ্বস্তরে জ্বালানিবাজারের সামগ্রিক পরিচালনব্যবস্থা বা ম্যানেজমেন্ট ঠিক কেমন রূপ নেবে।
মূলত ওপেকের বেঁধে দেওয়া উৎপাদন ‘কোটা’ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চরম অসন্তোষ জানিয়ে আসছিল ইউএই। এই কোটা সিস্টেমের গ্যাঁড়াকলে সদস্যদেশগুলোর তেল উৎপাদনের একটি নির্দিষ্ট সীমা বা লিমিটেশন থাকে। গত কয়েক বছরে তেল উত্তোলনের সক্ষমতা বাড়াতে আরব আমিরাত বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করলেও, ওপেকের নিয়মের কারণে আন্তর্জাতিক মার্কেটে তারা নিজেদের কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সাপ্লাই দিতে পারছিল না।
আশ্চর্যজনকভাবে, আরব আমিরাত এমন এক সময়ে এই সিদ্ধান্ত নিল, যখন বিশ্বজুড়ে নতুন তেল সরবরাহের জন্য রীতিমতো হাহাকার চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান তীব্র যুদ্ধের কারণে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি এখনো অবরুদ্ধ হয়ে আছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে হু হু করে বাড়ছে তেলের দাম। ঠিক এই সুযোগটিই কাজে লাগাতে চাইছে ইউএই। গ্লোবাল ডিমান্ড বা চাহিদা বাড়তে থাকায় তারা এখন নিজেদের উৎপাদন বাড়িয়ে তুলনামূলক কিছুটা কম দামে বাজারে তেল ছাড়ার শক্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এ বিষয়ে ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকস’ (পিআইআইই)-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো আদনান মাজারেই কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান দেন। তিনি জানান, কোনোভাবে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অতিরিক্ত তেল উৎপাদন করা সম্ভব হবে। সাপ্লাই ও ডিমান্ডের এই সমীকরণ মিললে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের চাপ বেশ খানিকটা কমে আসবে। মাজারেই আরও স্পষ্ট করেন যে, ওপেক এবং ওপেক প্লাস জোট দুর্বল হয়ে পড়াটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর। কারণ, বিশ্ববাজারে এখনো তেলের দাম নির্ধারণে এই জোটগুলোর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। তাদের সেই দাপট কমলে মার্কিন অর্থনীতিতে অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
যুদ্ধের কারণে তেলের দামের গ্রাফ কতটা ভয়াবহ ছিল, তা সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। গত বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ দশমিক ৪১ ডলারের রেকর্ড ছুঁয়েছিল, যদিও আজ শনিবার তা কিছুটা কমে ১০৮ ডলারে নেমে এসেছে। একই দিন (বৃহস্পতিবার) যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৩৩ ডলার, যা ইরানে হামলা শুরুর আগের দিনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ!
এদিকে, ভয়াবহ এই যুদ্ধ তৃতীয় মাসে গড়ালেও সাধারণ ভোক্তাদের দৈনন্দিন জীবনে কোনো স্বস্তি ফেরেনি। জ্বালানির এমন আকাশছোঁয়া দামের কারণে হু হু করে বাড়ছে মূল্যস্ফীতি, বাড়ছে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ভার। সামনেই নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন। তাই এই লাগামহীন বাজার পরিস্থিতি বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রয়টার্স ও ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের কর্মদক্ষতা ও জনপ্রিয়তার পারদ বেশ খানিকটা নিচে নেমেছে। আগের জরিপে তাঁর প্রতি মানুষের সমর্থন ছিল ৩৬ শতাংশ, যা এখন কমে মাত্র ৩৪ শতাংশে এসে ঠেকেছে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বেশ আশাবাদী। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হলেই গ্যাসের দাম হঠাৎই নেমে যাবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের বহুমুখী লাভ ও ভূরাজনৈতিক হিসাবনিকাশ
বর্তমান এই সংকটময় বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ‘অস্বাভাবিক মুনাফা’ পকেটে পুরছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ তেল ও গ্যাস উৎপাদকেরা। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই তাদের লাভের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, আমিরাতের অতিরিক্ত তেল বিশ্ববাজারে প্রবেশ করলে মার্কিন উৎপাদকদের এই অতিমুনাফা কিছুটা হলেও লাগামের মধ্যে আসবে।
অন্যদিকে, এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রোকেমিক্যাল খাতও বিশাল লাভের মুখ দেখতে পারে। আধুনিক জীবনের প্রায় প্রতিটি স্তরে-সার, সৌর প্যানেল, পোশাক, প্রসাধনী, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ইলেকট্রনিকস থেকে শুরু করে ওষুধ শিল্পে পেট্রোকেমিক্যালের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। তাই সরাসরি জ্বালানি হিসেবে তেলের ব্যবহার কমলেও, পেট্রোকেমিক্যালের কাঁচামাল হিসেবে তেলের ডিমান্ড কখনোই কমবে না। পিআইআইই-এর একটি সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, পেট্রোকেমিক্যাল খাতই এখন বিশ্বে তেলের চাহিদার সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল উৎসে পরিণত হয়েছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী। আদনান মাজারেই মনে করেন, এই সুযোগে ভেনেজুয়েলার তেল যদি কোনোভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আসে, তবে বিশ্ববাজারে মার্কিন আধিপত্য একচ্ছত্র রূপ নেবে।
র্যাচেল জিয়েম্বার মতে, আমিরাতের এই ওপেক ত্যাগের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার স্পষ্ট ইঙ্গিত। এর মাধ্যমে আরব আমিরাত প্রমাণ করল যে তারা বিশ্ববাণিজ্যে নিজেদের আরও বেশি উন্মুক্ত করতে এবং গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন পুনর্গঠনে সরাসরি ভূমিকা রাখতে মরিয়া। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মাত্র গত মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি ‘কারেন্সি সোয়াপ’ বা মুদ্রা অদলবদল চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিল আরব আমিরাত। আর ঠিক তার পরপরই ওপেক ছাড়ার এই চূড়ান্ত ঘোষণা এল। বিশেষজ্ঞদের চোখে এটি নিছক কোনো অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং নিখুঁত রাজনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক। আদনান মাজারেই ব্যাপারটিকে ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘এ ঘটনায় বোঝা যায়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউএইর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত।’
আমিরাতের এই সাহসী পদক্ষেপ ওপেকের অন্য সদস্যদেশগুলোর মধ্যেও এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। যদি অন্য দেশগুলোও একই পথে হাঁটে, তবে অচিরেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমতে বাধ্য। তবে মাজারেই মনে করেন, ‘ওপেক টিকে থাকবে, তবে আগের তুলনায় দুর্বল হবে, তার কার্যকারিতা কমবে।’
শুধু ওপেক নয়, ইরানে চলমান এই যুদ্ধের ডমিনো ইফেক্ট হিসেবে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসি (বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিয়ে গঠিত জোট) কীভাবে পুনর্গঠিত হয়, সেদিকেও কড়া নজর রাখছেন মাজারেই। তিনি একটি বিস্ফোরক শঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, ‘প্রশ্ন হচ্ছে, জিসিসি আদৌ টিকে থাকবে কি না।’
অন্যদিকে, এই চলমান সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও মজবুত হবে, নাকি দেশগুলোর মধ্যে স্বার্থের লড়াই তীব্র হবে-সেটিই এখন দেখার বিষয় বলে মনে করেন র্যাচেল জিয়েম্বা। তিনি তাঁর বিশ্লেষণে বলেন, ‘ওপেক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেরিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো, বিভিন্ন দেশ যে চলমান পরিস্থিতিতে নানাভাবে ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা করছে, তার একটি উপায়। চলমান যে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাব্যবস্থা, তার মধ্যে নিজেদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে মানানসই সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা।’
সব মিলিয়ে পরিবর্তিত এই বিশ্ব পরিস্থিতিতে নিজেদের জাতীয় ও আঞ্চলিক স্বার্থ বজায় রেখে আরব আমিরাত আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির মাঠে এক ‘গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়’ হয়েই দাপটের সঙ্গে টিকে থাকবে বলে প্রত্যাশা করছেন জিয়েম্বা।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।