বদলে যাচ্ছে ঢাকার মেট্রোস্টেশনের চিত্র: যাত্রী টানতে আউটলেটের পসরা সাজিয়েছে ফ্রেশ, টেস্টি ট্রিটসহ ১০ বড় প্রতিষ্ঠান

রাজধানী ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসা মেট্রোরেল এবার কেবল যাতায়াতের মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এটি রূপ নিচ্ছে এক জমজমাট বাণিজ্যিক কেন্দ্রে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চলাচলকারী এই আধুনিক যাতায়াত ব্যবস্থায় প্রতিদিন গড়ে ৫ লাখ মানুষের ভ্রমণের সক্ষমতা রয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৪ লাখেরও বেশি যাত্রী এই রুট ব্যবহার করছেন। বিপুলসংখ্যক এই কর্মব্যস্ত মানুষের যাতায়াতকে কেন্দ্র করে স্টেশনগুলোতে আউটলেট বা বিক্রয়কেন্দ্র চালুর এক বিশাল বাণিজ্যিক কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে।


ইতোমধ্যেই মেট্রোরেলের ১৬টি স্টেশনে মোট ১০টি স্বনামধন্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ২৬টি দোকান বা আউটলেট বরাদ্দ দিয়েছে মেট্রোরেল পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ। এই বিশাল বাণিজ্যিক দৌড়ে জায়গা করে নেওয়া শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ফ্রেশ’, ‘টেস্টি ট্রিট’, ‘আকিজ রিসোর্সেস’ এবং ‘ঘরের বাজার’-এর মতো জনপ্রিয় সব ব্র্যান্ড। এর বাইরেও আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সফলভাবে দোকান বরাদ্দ নিতে সক্ষম হয়েছে।


কেন মেট্রোস্টেশনের প্রতি এত আগ্রহ? দোকান বরাদ্দ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রচলিত কোনো শপিং মল বা নির্দিষ্ট এলাকার বাজারে দোকান নিলে মূলত ওই এলাকার স্থানীয় ক্রেতাদের কাছেই পণ্য পৌঁছানো যায়। কিন্তু মেট্রোরেল স্টেশনের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার নতুন মুখ ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সমাগম ঘটে। ফলে খুব সহজেই বিশাল একটি ক্রেতাগোষ্ঠীর কাছে ব্র্যান্ডের পরিচিতি ও পণ্য পৌঁছানো সম্ভব হয়। তাছাড়া, ব্যস্ত যাত্রীরা ঘরে ফেরার পথে অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সেরে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। ঠিক এই ‘অন-দ্য-গো’ কেনাকাটার সুবিধার কারণেই স্টেশনকেন্দ্রিক আউটলেটের প্রতি করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ তুঙ্গে।


কোন ব্র্যান্ড কী সুবিধা দিচ্ছে? প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের জনপ্রিয় বেকারি ব্র্যান্ড ‘টেস্টি ট্রিট’ শেওড়াপাড়া এবং কাজীপাড়া মেট্রোস্টেশনে ইতোমধ্যে তাদের ২টি আউটলেট চালু করে দিয়েছে। সেখানে যাত্রীদের জন্য নানা ধরনের সুস্বাদু খাদ্যসামগ্রীর পসরা সাজানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা মূলত ১৫টি দোকানের জন্য আবেদন করেছিলেন। তবে তীব্র প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে অংশ নিয়ে তারা ১টি দোকান বরাদ্দ পেয়েছেন, আর বাকি ১টি আউটলেট ‘ফ্রেঞ্চাইজি’ মডেলে পরিচালিত হচ্ছে।


এ প্রসঙ্গে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল দৈনিক প্রথম আলোকে বলেন, "প্রতিদিন অনেক যাত্রী মেট্রোরেলে যাতায়াত করেন। তাঁদের কাছে নিজেদের পণ্য বিক্রি করতেই আমাদের এ উদ্যোগ। যদিও ১৫টি আউটলেটের জন্য আবেদন করে আমরা ১টি দোকান বরাদ্দ পেয়েছি।"


অন্যদিকে, মেট্রোরেল স্টেশনে সবচেয়ে বেশি দোকান বরাদ্দ পেয়ে চমক দেখিয়েছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই)। ১০টি আউটলেটের আবেদন করে দরপত্রের মাধ্যমে তারা ৯টি স্টেশনেই দোকান বরাদ্দ পেয়েছে। এমজিআই এই ৯টি স্টেশনে নিজস্ব ব্র্যান্ড 'ফ্রেশ'-এর সুপারশপ চালু করবে। ইতোমধ্যে পল্লবী স্টেশনে পরীক্ষামূলকভাবে একটি সুপারশপ চালু করেছে তারা। ঈদের পর সবগুলো স্টেশনে পুরোদমে শপগুলো চালুর মহাপরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। জানা গেছে, মিরপুর স্টেশনে সবচেয়ে বড়, প্রায় ২ হাজার বর্গফুটের এক বিশাল সুপারশপ চালু করবে তারা।


মেঘনা গ্রুপের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা কাজী মু. মহিউদ্দীন প্রথম আলোকে জানান, "আমরা যেসব সুপারশপ চালুর করব, সেখানে মেট্রোর যাত্রীরা গৃহস্থালি সব ধরনের সামগ্রী পাবেন। মাছ-মাংস ছাড়া সব ধরনের নিত্যপণ্য এবং প্রক্রিয়াজাত রান্নার উপযোগী উপকরণ বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে এসব সুপারশপে। বিপুলসংখ্যক যাত্রীর কথা মাথায় রেখেই এ উদ্যোগ নিয়েছে এমজিআই।"


অনলাইন ক্রেতাদের কাছে পরিচিত নাম ‘ঘরের বাজার’ ২০২০ সাল থেকে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে পণ্য বিক্রি করে আসলেও, এই প্রথমবারের মতো তারা ফিজিক্যাল আউটলেট চালু করেছে মেট্রোরেল স্টেশনে। দরপত্রের মাধ্যমে তারা মোট ৬টি দোকান বরাদ্দ পেয়েছে। এর মধ্যে গত জানুয়ারিতে শাহবাগ স্টেশনে তারা প্রথম আউটলেট খোলে। পরবর্তীতে সচিবালয় ও শেওড়াপাড়া স্টেশনে আরও দুটি আউটলেট চালু করা হয়। সবশেষ টিএসসিতেও নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে এই ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানটি। তাদের আউটলেটগুলোতে মধু, খেজুর, ঘি, বাদাম, তেলসহ ২০ ধরনের প্রিমিয়াম পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে।


সম্প্রতি সচিবালয় স্টেশনে ‘ঘরের বাজার’-এর আউটলেট ঘুরে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। ৫ জন কর্মী নিয়ে সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত টানা খোলা থাকে এই আউটলেট। সেখানকার বিক্রয়কর্মী সালমান ফরাসি জানান, রোজার এই পবিত্র মাসে যাত্রীদের কাছে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে তাদের খেজুর। নতুন আউটলেট হলেও ক্রেতাদের কাছ থেকে বেশ অভাবনীয় সাড়া পাচ্ছেন বলে জানান তিনি।


এসব বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ‘ঢাকা আইসক্রিম’, ‘তানভীর ফুড’, ‘ময়মনসিংহ অ্যাগ্রো’ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানও মেট্রোস্টেশনে নিজেদের জায়গা পাকা করেছে।


রাজস্ব আয়ের নতুন দুয়ার উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ১৬টি স্টেশনে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য মোট ৩১টি দোকান নির্মাণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ২৬টির বরাদ্দ সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকি ৫টি বরাদ্দের একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। মজার বিষয় হলো, সাধারণ বা প্রচলিত মার্কেটের চেয়ে অনেক চড়া ভাড়ায় এসব দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।


মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, এই ৩১টি দোকানের বিপরীতে মোট ৪৫২টি আবেদন জমা পড়েছিল! ফলে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে বেশ ভালো দামেই ৫ বছরের চুক্তিতে দোকানগুলো লিজ দেওয়া সম্ভব হয়েছে।


মেট্রোরেলের বিপণন ব্যবস্থাপক ওসমান গণি প্রথম আলোকে বলেন, "প্রতিযোগিতা বেশি থাকায় বাজারদরের চেয়ে বেশি ভাড়া পেয়েছি আমরা। প্রতি বর্গফুটের ভাড়া পাওয়া গেছে ৪০০ থেকে ৭০০ টাকা।" তিনি আরও জানান, সবগুলো দোকান চালু হলে এই ৩১টি আউটলেট থেকে কর্তৃপক্ষের বছরে শুধু ভাড়াবাবদ আয় হবে ১০ কোটি টাকার বেশি।


দোকানের পাশাপাশি যাত্রীদের নগদ টাকার চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন ব্যাংকের ১৫৩টি ‘এটিএম বুথ’ স্থাপনের জন্যও স্থান বরাদ্দ দিয়েছে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ। এই বিপুল সংখ্যক এটিএম বুথ থেকে ভাড়াবাবদ বছরে আরও সাড়ে ৮ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এমন অভূতপূর্ব সাড়া পেয়ে কর্তৃপক্ষ এখন স্টেশনের অন্যান্য ফাঁকা স্থানগুলোতেও নতুন করে মিনি মার্কেট বা দোকান বরাদ্দ দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।