বিশ্ব রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক বা ‘এমওইউ’ (MOU) চুক্তিটি এখন সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর এবং এর কোনো অস্তিত্ব নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। বুধবার (৮ জুলাই) তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় আয়োজিত ন্যাটোর (NATO) হাই-ভোল্টেজ শীর্ষ সম্মেলনে সংবাদকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প মার্কিন প্রশাসনের এই অনড় ও চূড়ান্ত অবস্থানের কথা প্রকাশ্যে আনেন।
আঙ্কারায় ন্যাটোর সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা ও বিদ্যমান চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক বিধ্বংসী সামরিক সংঘাতের জেরে ওই সমঝোতা চুক্তির আর কোনো উপযোগিতা আছে কি না—এমন প্রশ্নে ট্রাম্প সরাসরি উত্তর দিয়ে বলেন, ‘আমি মনে করি এটি শেষ’ (I think it’s finished)। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই একটি বাক্যেই গত কয়েক বছরের দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও সমঝোতার শেষ আশাটুকুও ধূলিসাৎ হয়ে গেল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এই কূটনৈতিক বিচ্ছেদের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে গত কয়েক দিনের নজিরবিহীন সামরিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী গত রাতে ইরানের অভ্যন্তরে অবস্থান করা অত্যন্ত ‘বিপজ্জনক’ ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে বিধ্বংসী ও শক্তিশালী বিমান হামলা পরিচালনা করেছে। ইরানের নীতিনির্ধারক ও উগ্রপন্থীদের কঠোর সমালোচনা করে ট্রাম্প তাঁদের ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে এ ধরনের ‘ডেডলাইন’ বা কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া ওয়াশিংটনের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা ‘সেন্টকম’ (CENTCOM) এক বিশেষ প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করেছে যে, গত রাতে ইরানের সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে তাদের নিখুঁত ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদী যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে আশিটিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু সফলভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। আমেরিকার এই বিধ্বংসী বিমান হামলার জবাবে ইরানও পাল্টা আঘাত হেনেছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা ‘আইআরজিসি’ (IRGC) বাহরাইন এবং কুয়েতে অবস্থিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে আশিটির বেশি লক্ষ্যবস্তু লক্ষ্য করে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
তেহরানের পক্ষ থেকে আজ বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, মার্কিন আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দিতে তাদের নৌ এবং বিমান বাহিনী যৌথভাবে এই বিশাল পাল্টা সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। পাল্টাপাল্টি এই হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই চুক্তি বাতিলের ঘোষণা কেবল একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি অঞ্চলটিতে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের হাতছানি দিচ্ছে। যেখানে ‘বাজেট’ ও সামরিক সক্ষমতার লড়াইয়ে দুই পক্ষই এখন সম্মুখ সমরে লিপ্ত হওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।