ইরান যুদ্ধের চোরাবালিতে ট্রাম্প: হোয়াইট হাউসের সামনে কি তবে ‘মহামন্দার’ অশনিসংকেত?

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বিদেশে যুদ্ধ এড়িয়ে চলার অঙ্গীকার করলেও বাস্তবতার ‘প্যাকেজ’ ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য ভিন্ন এক রূপ ধারণ করেছে। ইরান যুদ্ধের চোরাবালি থেকে চাইলেই এখন আর সহজে বের হতে পারছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট। দুই দেশের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা শুরু হওয়ায় দীর্ঘদিনের সব কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও সংঘাত নিরসনের আশা আবারও বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে তেহরানের সাথে ওয়াশিংটনের ভঙ্গুর ‘যুদ্ধবিরতি’ ভেস্তে যাওয়ায় ট্রাম্পের সামনে এখন সম্মানজনক প্রস্থানের আর কোনো সহজ বিকল্প খোলা নেই।

সাম্প্রতিক উত্তেজনার সূত্রপাত মূলত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। এর মোক্ষম জবাব দিতে মার্কিন বাহিনী ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে বোমাবর্ষণ শুরু করলে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানও বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে শক্তিশালী হামলা চালায়। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, সংঘাত অবসানের লক্ষে সই হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতা চুক্তিটি এখন পুরোপুরি অকার্যকর। গত বুধবার তিনি ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান পরিচালনার যে নির্দেশ দিয়েছেন, তাতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে গেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন এক ‘ভাইরাস’ বা অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ১৭ জুন দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MOU) সই হয়েছিল। কিন্তু সেই চুক্তির বয়স তিন সপ্তাহ পার না হতেই শুরু হওয়া এই নতুন সংঘাত ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের ‘বাজেট’ ও জনপ্রিয়তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। রয়টার্স/ইপসোস-এর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বর্তমানে মাত্র ৩৪ শতাংশে নেমে এসেছে, যা তাঁর ক্ষমতায় আসার পর সর্বনিম্ন। সামনেই নভেম্বর মাসে মার্কিন কংগ্রেসের অন্তর্বর্তী নির্বাচন; এমন এক গুরুত্বপূর্ণ ‘ডেডলাইন’-এর আগে এই যুদ্ধ এবং কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এখন নিজের তৈরি এক ফাঁদে বন্দী হয়ে পড়েছেন। সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মধ্যস্থতাকারী অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, “ট্রাম্প নিজেকে একটি বাক্সে বন্দী করে ফেলেছেন; সামরিক বা কূটনৈতিক কোনো পথেই এখন ইরানের কাছ থেকে তাঁর বেশি কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।” অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের আটলান্টিক কাউন্সিলের কর্মকর্তা জনাথন প্যানিকফ মনে করেন, পরিস্থিতি হয়তো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে না, তবে এটি এক ধরনের ‘নিয়ন্ত্রিত অস্থিরতা’ হিসেবে চলতে থাকবে।

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এই সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের পাঁচ ভাগের এক ভাগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখা ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তারা এই নৌপথে বড় ভূমিকা রাখতে চায়। অন্যদিকে ট্রাম্প ও তাঁর আরব মিত্ররা এই পথ সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে অনড়। জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ লরা ব্লুমেনফেল্ড মনে করেন, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভারের অর্থনৈতিক ব্যর্থতার ইতিহাস ট্রাম্পকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ট্রাম্প নিজেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, এই যুদ্ধ চালিয়ে গেলে তাঁর অবস্থাও ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ বা মহামন্দার সময় ক্ষমতায় থাকা হুভারের মতো হতে পারে। সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধ থেকে সম্মানজনক প্রস্থান এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য ইতিহাসের কঠিনতম পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।