ইয়াজিদি কিশোরীদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন: জার্মানিতে ইরাকি দম্পতির ঐতিহাসিক দণ্ড

ইরাকে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) তাণ্ডব চলাকালে দুই ইয়াজিদি কিশোরীকে দাসত্বে বাধ্য করা এবং তাদের ওপর অবর্ণনীয় পৈশাচিক নির্যাতন চালানোর অপরাধে এক ইরাকি দম্পতিকে কঠোর সাজা দিয়েছেন জার্মানির একটি আদালত। মিউনিখের উচ্চ আঞ্চলিক আদালত সোমবার (১৩ জুলাই ২০২৬) এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। অভিযুক্ত এই দম্পতিকে কেবল যুদ্ধাপরাধীই নয়, বরং সরাসরি জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের সক্রিয় সদস্য হিসেবেও দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

জার্মানির কঠোর গোপনীয়তা আইনের কারণে ‘টোয়ানা এইচ.এস.’ নামে পরিচিত ওই ব্যক্তিকে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং শিশুদের ওপর গুরুতর যৌন নির্যাতনসহ একাধিক নৃশংস অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, তাঁর স্ত্রী ‘এশিয়া আর. এ.’-কে সাড়ে নয় বছরের কিশোর-কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই দম্পতিকে ২০২৪ সালে জার্মানির বাভারিয়া অঞ্চল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই দম্পতি আইএসের দখলকৃত এলাকায় দুই অসহায় ইয়াজিদি কিশোরীকে বন্দি করে রাখা এবং তাদের ওপর ক্রমাগত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানোর জন্য সরাসরি দায়ী।

মামলার বিবরণে উঠে আসা তথ্যগুলো মধ্যযুগের বর্বরতাকেও হার মানায়। প্রসিকিউটররা জানান, টোয়ানা এইচ.এস. ২০০০-এর দশকের শুরুতে জার্মানিতে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে এসেছিলেন এবং মিউনিখে একজন ‘হেয়ারড্রেসার’ হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর একটি জার্মান সন্তানও ছিল। ২০১৫ সালে তিনি ইরাকে ফিরে গিয়ে আইএসে যোগ দেন এবং মসুলে একটি ক্রীতদাস বাজার থেকে মাত্র পাঁচ বছর বয়সী এক ইয়াজিদি শিশুকে ‘দাসী’ হিসেবে কেনেন। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে তাঁরা ১২ বছর বয়সী আরও এক কিশোরীকে কেনেন। এই দম্পতি শিশুদের দিয়ে জোরপূর্বক ঘরের কাজ ও শিশু পরিচর্যা করাতেন এবং তাদের নিজ ধর্ম পালনে বাধা দিতেন। সবচেয়ে লোমহর্ষক বিষয় হলো, টোয়ানা ওই দুই শিশুকে বারবার ধর্ষণ করতেন এবং তাঁর স্ত্রী এশিয়া ওই ছোট শিশুটির হাতে গরম পানি দিয়ে ছ্যাঁকা দিতেন। বিচার চলাকালীন এক ইয়াজিদি কিশোরীর প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য আদালতকে স্তব্ধ করে দেয়।

২০১৪ সালে আইএসের হামলায় উত্তর ইরাকের ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের ওপর যে পরিকল্পিত গণহত্যা চালানো হয়েছিল, জার্মানি ইতিমধ্যেই তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই বিচারটি আন্তর্জাতিক আইনের ‘সার্বজনীন বিচারব্যবস্থা’ (Universal Jurisdiction) নীতির আওতায় পরিচালিত হয়েছে। এই বিশেষ আইনি ‘প্রটোকল’ অনুযায়ী, কোনো যুদ্ধাপরাধ বা গণহত্যা বিশ্বের যে প্রান্তেই সংঘটিত হোক না কেন, যেকোনো দেশের আদালত তার বিচার করার এক্তিয়ার রাখে।

আদালতে রায় ঘোষণার আগে এশিয়া আর. এ. তাঁর কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়ে বিলাপ করলেও টোয়ানা এইচ.এস. কোনো ধরনের বক্তব্য দিতে অস্বীকার করেন। উল্লেখ্য যে, দ্বিতীয় ইয়াজিদি কিশোরীটির এখনও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি, যা এই পুরো ঘটনার ট্র্যাজেডিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই রায়কে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার কর্মীরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে এক বিশাল জয় হিসেবে দেখছেন।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।