ক্ষমতার মসনদ ছাড়লেও কিশিদার গলায় কেন যুদ্ধের হুঁশিয়ারি? অস্থিতিশীল বিশ্ব নিয়ে বড় বার্তা

জাপানের রাজনীতিতে ফুমিও কিশিদা কেবল একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নন, বরং বর্তমানের চরম অস্থিতিশীল বিশ্ব পরিস্থিতিতে তিনি অন্যতম প্রধান এক কূটনৈতিক কান্ডারি। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করা এই প্রভাবশালী নেতা সম্প্রতি টোকিও’র ‘ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব অব জাপান’ (FCCJ)-এ এক দীর্ঘ ভাষণ দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল—অনিশ্চিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জাপানের ভবিষ্যৎ কূটনীতি এবং ক্ষমতার পরিবর্তনশীল ভারসাম্য। প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সরে দাঁড়ালেও আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে তাঁর প্রজ্ঞা যে এখনও জাপানের জন্য অপরিহার্য, তা তাঁর সাম্প্রতিক তৎপরতায় স্পষ্ট।

প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন কিশিদাকে কেবল করোনা মহামারির মতো বৈশ্বিক সংকট নয়, বরং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের হত্যাকাণ্ড, ইউনিফিকেশন গির্জা বিতর্ক এবং ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) অভ্যন্তরীণ অর্থ কেলেঙ্কারির মতো ‘ভাইরাস’-এর মতো ছড়িয়ে পড়া রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে। তবে এসবের মাঝেও তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাপানের অবস্থানকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর প্রথম জাপানি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি পশ্চিমা সামরিক জোট ‘ন্যাটো’-র শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন এবং ২০২৩ সালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একটি সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রে (ইউক্রেন) গোপন সফর করেন। এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইতিহাসে কোনো জাপানি প্রধানমন্ত্রীর সক্রিয় যুদ্ধাঞ্চলে প্রথম পদক্ষেপ, যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল।

কিশিদার মতে, শীতল যুদ্ধের অবসানের পর একক পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের যে দাপট ছিল, তার অবসান ঘটছে। চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক উত্থান বিশ্বের কৌশলগত প্রেক্ষাপটকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি নিয়ে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, এটি কেবল একজন নেতার ক্ষণস্থায়ী মানসিকতা নয়, বরং মার্কিন জনগণের একটি বড় অংশের ক্ষোভ ও গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রতিফলন। বিশ্বজুড়ে চরম ডানপন্থী শক্তির উত্থান এবং অন্তর্মুখী প্রবণতাকে তিনি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন, কারণ এগুলো বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের ক্রমবর্ধমান অনাস্থারই বহিঃপ্রকাশ।

জাপানের মতো একটি দ্বীপরাষ্ট্র, যার প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং যেখানে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর হার বাড়ছে ও জন্মহার কমছে, সেখানে ভবিষ্যতের সুরক্ষা কীভাবে সম্ভব? কিশিদা এর উত্তর দিয়েছেন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে। তাঁর মতে, ‘আইনের শাসন’ বা ‘রুল অব ল’ সমুন্নত রাখাই জাপানের একমাত্র রক্ষাকবচ। তিনি বহুপক্ষীয়তা, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং মুক্ত ও অবাধ বাণিজ্যের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি মনে করেন, পরাশক্তিদের বলপূর্বক স্থিতাবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টার বিরুদ্ধে জাপানকে প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তার সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। জাপানের সীমিত সম্পদের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক আইনই হবে দেশটির টিকে থাকার প্রধান হাতিয়ার।

কিশিদার এই কূটনৈতিক দর্শনের মূলে রয়েছে ‘মানবিক মর্যাদা’ ও ‘মানব নিরাপত্তা’। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি পারমাণবিক অস্ত্রহীন বিশ্ব কোনো অলীক কল্পনা নয়, বরং এটি একটি আদর্শ যা ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য। বর্তমানে শিগেরু ইশিবা জাপানের প্রধানমন্ত্রী থাকলেও, কিশিদা এখনও ‘ক্যাবিনেট’-এর বাইরে থেকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বিশেষ দূত হিসেবে তাঁর ফিলিপাইন সফর প্রমাণ করে যে, অস্থিতিশীল এই বিশ্বের বিভিন্ন ‘ডেডলাইন’ বা সংকটময় মুহূর্তগুলোতে কিশিদার প্রজ্ঞা এখনও জাপানের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তাঁর মতে, জাপানকে আগামী দিনে আদর্শবাদ এবং কঠোর বাস্তবতার মধ্যে এক নিপুণ সমন্বয় ঘটিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।