মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের গন্ধ এখন আরও তীব্র ও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। বুধবার (১৫ জুলাই) পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘাত এক অভাবনীয় রূপ নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে ইরানি সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে ডজনখানেক বিধ্বংসী বিমান হামলা চালিয়েছে পেন্টাগন। একই সাথে তেহরানের প্রধান সমুদ্রবন্দরগুলোতে কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে ওয়াশিংটন। এই মার্কিন আগ্রাসনের সরাসরি জবাবে উপসাগরীয় তিনটি দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে একযোগে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। এই পাল্টাপাল্টি গোলারূপাতের ফলে বিশ্বজুড়ে নতুন এক যুদ্ধের ‘অশনিসংকেত’ দেখা দিয়েছে।
সংঘাতের ভয়াবহতা আঁচ করে ইরান সরকার সাফ জানিয়ে দিয়েছে, মার্কিন অবরোধ ও হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হবে। ইরানের বিশেষ সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস’ (IRGC) এক কঠোর বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, “এই অঞ্চলের তেল ও গ্যাস রপ্তানি হয় সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, নয়তো কারো জন্যই থাকবে না।” তেহরানের এমন অনড় অবস্থানের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ইতোমধ্যেই ১০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন এক ‘ডিজাস্টার’ বা বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, তাদের বিমান বাহিনী বন্দর আব্বাস, কিশ দ্বীপ এবং বন্দর ইমাম খোমেনিতে অবস্থিত ইরানের ডজনখানেক সামরিক ঘাঁটিতে নিখুঁতভাবে আঘাত হেনেছে। স্থানীয়রা এসব এলাকায় বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা নিশ্চিত করেছেন। মার্কিন হামলার জবাবে জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন যুদ্ধবিমান ঘাঁটিতে এবং বাহরাইন ও কুয়েতের মার্কিন স্থাপনাগুলোতে সফল ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানি সংবাদ সংস্থা ‘ইরনা’। এই পাল্টাপাল্টি হামলায় গত এক সপ্তাহে ইরানে অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আলটিমেটাম। ‘ফক্স নিউজ’-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত কঠোরভাবে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তেহরান যদি অবিলম্বে আলোচনার টেবিলে না আসে, তবে আগামী সপ্তাহে তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও প্রধান সেতুগুলোতে আরও ভয়াবহ হামলা চালানো হবে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই সংঘাতে ঘি ঢেলে জানিয়েছেন, ইসরায়েলে কোনো ধরনের হামলা চালানো হলে তার ‘দাঁতভাঙা’ জবাব দেওয়া হবে। দিমোনা শহর থেকে দেওয়া ভাষণে তিনি স্পষ্ট করেন যে, তেল আবিব কোনো আক্রমণই মুখ বুজে সহ্য করবে না।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত মাসে স্বাক্ষরিত ‘ইসলামাবাদ স্মারক’ নামক অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তিটি এখন পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের একতরফা অবরোধ ও হামলা এই চুক্তিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এর আগে মার্কিন ‘সেন্টকম’ প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার অভিযোগ করেন, গত এক সপ্তাহে ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে সাতটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে, যাতে ১২ জন বেসামরিক নাবিক হতাহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। ওমান উপকূলে একটি নরওয়েজীয় ট্যাংকারে বিস্ফোরণ এবং কুয়েতি নৌযানে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত—সব মিলিয়ে পারস্য উপসাগর এখন আক্ষরিক অর্থেই এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।