ইরাকের মাটি থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির দীর্ঘ কয়েক দশকের অধ্যায় এবার চূড়ান্তভাবে সমাপ্ত হতে যাচ্ছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশটি থেকে সমস্ত মার্কিন সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরাকের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে অনুষ্ঠিত এক রুদ্ধশ্বাস ও উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে এই ঐতিহাসিক ‘ডেডলাইন’ চূড়ান্ত করা হয়। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে স্পষ্ট জানান, ইরাকের নিরাপত্তায় এখন আর মার্কিন বাহিনীর সরাসরি উপস্থিতির প্রয়োজন দেখছেন না তিনি। তিনি বলেন, “আমরা এখন আর মনে করি না যে সেখানে আমাদের সামরিক বাহিনীর উপস্থিতির কোনো প্রয়োজন রয়েছে।” উল্লেখ্য, ইরাকে দীর্ঘ সময় ধরে ইসলামিক স্টেট বা আইএস বিরোধী বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল। এই সেনারা মূলত কুর্দি অঞ্চলের ইরবিল, বাগদাদ বিমানবন্দরের নিকটস্থ ঘাঁটি এবং সুরক্ষিত গ্রিন জোন এলাকায় অবস্থান করছিল। গত কয়েক মাসে এই সৈন্য সংখ্যা ধাপে ধাপে কমানো হলেও এবার সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এল।
ইরাকি প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি এই সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনাটিকে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার সাথে যুক্ত করেছেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছেন যে, মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার পর দেশের ভেতরে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী বা ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া বাহিনীকে সমান্তরাল শক্তি হিসেবে কাজ করতে দেওয়া হবে না। আল-জাইদি বলেন, “আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর আমেরিকান বাহিনী ইরাক ছেড়ে চলে যাবে এবং আমেরিকান কোম্পানিগুলো এখানে প্রবেশ করবে। ৩০ সেপ্টেম্বরের পর আমরা রাষ্ট্রের বাইরে অন্য কোনো গোষ্ঠীকে কোনো ধরনের অস্ত্র বহন করার অনুমতি দেব না।” তাঁর এই সাহসী অবস্থানের কারণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁকে একজন ‘চ্যাম্পিয়ন’ বা বীর হিসেবে অভিহিত করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী আল-জাইদির এই ওয়াশিংটন সফরের মূল লক্ষ্য কেবল সামরিক নয়, বরং ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কার। ইরাক এখন চাচ্ছে তাদের জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং বিদ্যুৎ খাতে বড় আকারের মার্কিন বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে। এই লক্ষ্যেই আগামী শুক্রবার ইরাক সরকার, শেভরন, টিআই ক্যাপিটাল এবং কাতারের ইউসিসি একটি ‘মেগা’ চুক্তি স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে। এই প্রজেক্টের আওতায় প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনে সক্ষম একটি বিশাল পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে, যা বসরা শহরকে হাদিথার সঙ্গে যুক্ত করবে। পরবর্তীতে এই পাইপলাইন সিরিয়া ও তুরস্কের বিভিন্ন সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে ইরাকের তেল সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ ও উভয় দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির এক বিশাল সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ইরাক এখন যুদ্ধের দামামা কাটিয়ে পুনর্গঠনের নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।