ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা জানিয়েছেন, ভারতের 'লাইন অব ক্রেডিট' (এলওসি) কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশে চলমান বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে দুই দেশই সন্তুষ্ট। তবে, যেসব বৃহৎ প্রকল্প প্রাথমিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, সেগুলো দ্রুত সমাধানের জন্য সক্রিয়ভাবে চেষ্টা চালানো হচ্ছে। আজ রোববার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে এক সৌজন্য বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান। এই ঘোষণা দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ধারাবাহিকতা এবং সুদূরপ্রসারী সম্পর্কের ইঙ্গিত বহন করে।
ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে তার বৈঠককে "অত্যন্ত ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ" হিসেবে অভিহিত করেছেন। আলোচনায় দুই দেশের মধ্যে আর্থিক খাতের সহযোগিতা জোরদার করা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় হয়েছে। হাইকমিশনার জোর দিয়ে বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে উভয় পক্ষই আগ্রহী।
প্রণয় ভার্মা দাবি করেন যে, ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোর সামগ্রিক অগ্রগতি সন্তোষজনক। তিনি স্বীকার করেন যে, কিছু বড় প্রকল্পে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে, তবে সেগুলো নিরসনে ইতিমধ্যেই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সামগ্রিকভাবে, প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নিয়ে দুই পক্ষই সন্তুষ্ট এবং সামনের দিনে আরও দ্রুত বাস্তবায়নের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
এলওসি কর্মসূচি: বিস্তারিত এক নজরে
ভারতের এক্সিম ব্যাংক থেকে এই এলওসির অর্থ পাওয়া যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ পর্যন্ত তিনটি লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) আওতায় ৭৩৬ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। এই ঋণের অর্থ মূলত অবকাঠামো, বিদ্যুৎ এবং যোগাযোগ খাতের প্রকল্পগুলিতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
প্রথম এলওসি: ২০১০ সালে ১০০ কোটি ডলারের প্রথম এলওসি দেওয়া হয়। এর আওতায় মোট ১৫টি প্রকল্প ছিল, যার মধ্যে ১২টি প্রকল্প ইতিমধ্যেই সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকি তিনটি বর্তমানে চলমান রয়েছে।
দ্বিতীয় এলওসি: দ্বিতীয় এলওসিতে নেওয়া ১৫টি প্রকল্পের মধ্যে দুটি শেষ হয়েছে, ১০টি বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন এবং তিনটি প্রকল্প প্রস্তাবনা পর্যায়ে রয়েছে।
তৃতীয় এলওসি: তৃতীয় এলওসির আওতায় ১৩টি প্রকল্পের মধ্যে আটটি চলমান আছে এবং বাকি পাঁচটি প্রস্তাবনা পর্যায়ে রয়েছে।
আর্থিক খাতের অগ্রাধিকার ও ডিজিটাল বিপ্লব
প্রণয় ভার্মা আরও জানান, বৈঠকে বাংলাদেশের আর্থিক খাতের অগ্রাধিকার বিষয়গুলো নিয়েও গভীর আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে, ব্যবসা সহজীকরণ (ease of doing business), কর সংস্কার (tax reform) এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও বেশি মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
হাইকমিশনার অর্থমন্ত্রীকে ভারতের ডিজিটাল ব্যবস্থায় জনঅবকাঠামোর মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি (financial inclusion) বাড়ানোর অভিজ্ঞতা সম্পর্কে অবহিত করেছেন। প্রযুক্তির মাধ্যমে কীভাবে অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা যায়, সে বিষয়েও বৈঠকে বিস্তারিত মতবিনিময় হয়। দুই দেশের উন্নয়ন সহযোগিতা প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হয়েছে, যা পারস্পরিক উন্নয়নে সহায়ক হবে।
প্রণয় ভার্মা জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সমুদ্র, স্থল ও আকাশপথে বিদ্যমান যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও সহজ করে ব্যবসা–বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এটি উভয় দেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করবে।
তিনি উল্লেখ করেন যে, ব্যবসা সহজীকরণের অংশ হিসেবে বিভিন্ন প্রক্রিয়াকে আরও সরল করা গেলে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়বে। এর ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি ভারতের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।
হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা আরও জানান, দুই দেশের অর্থনীতিকে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এছাড়াও, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্দর ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়েও ভবিষ্যতে ইতিবাচক ও গঠনমূলক আলোচনা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এটি আঞ্চলিক সংযোগ ও বাণিজ্য বৃদ্ধিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।