দেশের অন্যতম জনপ্রিয় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’-এ বড় ধরনের প্রশাসনিক রদবদলের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। একই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, জালিয়াতি ও ভয়াবহ আর্থিক অনিয়মে লিপ্ত থাকা সাবেক পরিচালনা পর্ষদের কোনো সদস্যের পুনরায় এই প্রতিষ্ঠানে ফিরে আসার আর কোনো সুযোগ নেই।
গত বুধবার (৪ মার্চ) নগদে নিয়োজিত প্রশাসক টিমের সঙ্গে এক বিশেষ বৈঠক শেষে গভর্নর এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ এই কর্মকর্তা মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দীর্ঘ সময় অন্য কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সমীচীন নয়। এর ফলে তাদের মূল দাপ্তরিক কাজ ব্যাহত হয়। গভর্নরের এই অবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, বর্তমানে নগদের প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা পরিচালক মো. মোতাসেম বিল্লাহকে পরোক্ষভাবে এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে প্রশাসক জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখনই চাইবে, তারা নিজ নিজ দপ্তরে ফিরে যেতে প্রস্তুত।
বিগত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে নগদে পরিচালিত বিশেষ পরিদর্শনে একের পর এক পিলে চমকানো অনিয়মের প্রমাণ বেরিয়ে আসছে। মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান স্পষ্ট করে বলেন, “নগদের মালিকানা মূলত ডাক বিভাগের। প্রতিষ্ঠানটি জনস্বার্থে ডাক বিভাগের অধীনেই পরিচালিত হবে। তবে প্রয়োজনে সরকার নতুন কোনো দক্ষ ও স্বচ্ছ বিনিয়োগকারীর কাছে এটি হস্তান্তরের সিদ্ধান্তও নিতে পারে।” উল্লেখ্য, নগদ এখনো কোনো ‘ফুল লাইসেন্স’ বা পূর্ণাঙ্গ লাইসেন্স পায়নি; এটি বর্তমানে কেবল একটি অন্তর্বর্তীকালীন লাইসেন্সের মাধ্যমে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রায় চার থেকে পাঁচ কোটি গ্রাহকের জমাকৃত আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই সেখানে প্রশাসক নিয়োগের এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
নগদে জালিয়াতির পরিধি কতটুকু বিস্তৃত ছিল, তা উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অডিট প্রতিষ্ঠান ‘কেপিএমজি’ (KPMG)-এর ফরেনসিক নিরীক্ষায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ভুয়া পরিবেশক ও এজেন্ট দেখিয়ে বিশাল অঙ্কের ই-মানি সৃষ্টির মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকার হিসাবের গরমিল করা হয়েছে। এর মধ্যে অনুমোদনহীন ৪১টি পরিবেশক হিসাব খুলে সরকারি ভাতার প্রায় ১ হাজার ৭১১ কোটি টাকা বের করে নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। এমনকি গত বছরের জুনেই বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছিল, নগদ কোনো প্রকৃত টাকা জমা না রেখেই অন্তত ৬৪৫ কোটি টাকার ‘ফেক ই-মানি’ ইস্যু করেছে, যা রাষ্ট্রের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই নগদের শীর্ষ কর্তারা লাপাত্তা রয়েছেন। তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তানভীর আহমেদসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নিয়াজ মোর্শেদ (এলিট), মারুফুল ইসলাম (ঝলক), এবং আলোচিত মুখ খন্দকার মোহাম্মদ সোলায়মান (সোলায়মান সুখন) অফিসে উপস্থিত না হওয়ায় তাঁদের বরখাস্ত করা হয়েছে। ফরেনসিক অডিটের তথ্যের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রাথমিক পরিদর্শনের মিল পাওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে অনিয়মে জড়িত এসব ব্যক্তিদের আইনি কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে। গ্রাহক স্বার্থ রক্ষায় এবং ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে স্বচ্ছতা ফেরাতে এই মুহূর্তে নতুন প্রশাসক নিয়োগ ও কাঠামোগত সংস্কারই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অগ্রাধিকার।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।