আধুনিক স্থাপত্যের বিস্ময় নিয়ে নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের সেন্ট্রাল পার্কের দক্ষিণ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি গগনচুম্বী অট্টালিকা। বিশ্বের অন্যতম দামী এই এলাকাটি পরিচিত ‘বিলিওনেয়ার্স রো’ নামে। দূর থেকে দেখলে এই আকাশচুম্বী ভবনগুলোকে আভিজাত্য আর সাফল্যের চূড়ান্ত শিখর মনে হতে পারে, কিন্তু সেই চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্যরকম নিস্তব্ধতা ও বিস্ময়কর বাস্তবতা।
বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই বিলাসবহুল ভবনগুলোর প্রায় অর্ধেক অ্যাপার্টমেন্টই এখন জনমানবহীন। বাইরের কাঁচের দেওয়ালে কৃত্রিম আলোর ঝলকানি থাকলেও ভেতরে প্রাণের স্পন্দন নেই। বিশ্বের অতিধনীদের কাছে এই অট্টালিকাগুলো এখন আর বসবাসের ‘ঘর’ নয়; বরং তাদের অর্জিত অঢেল সম্পদ জমিয়ে রাখার এক একটি সুরক্ষিত ‘সেফটি ডিপোজিট বক্স’ বা নিরাপদ ভল্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের প্রভাবশালী ধনকুবেরদের কাছে নিউইয়র্কের এই আবাসনগুলো কেবল মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, বরং আন্তর্জাতিক অর্থবাজারের অস্থিরতা থেকে পুঁজি রক্ষার একটি মোক্ষম কৌশল। বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, নিজ দেশের মুদ্রার মানের ক্রমাগত পতন এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচতে তারা মার্কিন ডলার-ভিত্তিক এই স্থাবর সম্পদে অর্থ বিনিয়োগ করছেন। এই বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন নয়, বরং মূলধনকে সুরক্ষিত রাখা।
নিরাপদ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই অ্যাপার্টমেন্টগুলোকে এখন স্বর্ণ কিংবা দামী শিল্পকর্মের মতো ‘সেফ হেভেন’ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। যখনই এই মালিকদের নগদ অর্থের প্রয়োজন হয়, তারা অনায়াসেই এই অ্যাপার্টমেন্টগুলো বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ বা তারল্য সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন।
নিউইয়র্কের আবাসন খাতে বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো চরম গোপনীয়তা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, প্রকৃত মালিকের পরিচয় গোপন রাখতে নামসর্বস্ব কোনো ‘শেল কোম্পানি’ বা এলএলসি (LLC)-এর নামে এই সম্পদগুলো কেনা হয়। যারা নিজ দেশে আয়ের উৎস আড়াল করতে চান কিংবা ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার কৌশল খুঁজছেন, তাদের কাছে এই অস্বচ্ছ পদ্ধতিটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
বছরের অধিকাংশ সময় এই ভবনগুলো অন্ধকার ও জনশূন্য পড়ে থাকে বলে স্থানীয়রা একে ‘ঘোস্ট টাওয়ার’ বা ভুতুড়ে অট্টালিকা বলে অভিহিত করছেন। মালিকদের ধারণা, ভাড়া দিলে অ্যাপার্টমেন্টের চাকচিক্য ও বিশেষত্ব নষ্ট হতে পারে, যা ভবিষ্যতে এর রিসেল ভ্যালু বা বিক্রয়মূল্য কমিয়ে দেবে। ফলে নগদ লাভের চেয়ে কয়েক কোটি ডলারের এই সম্পদ ফেলে রাখাকেই তারা বেশি লাভজনক বলে মনে করেন।
তবে এই বিলাসিতার ওপর এখন নতুন করের ছায়া ঘনীভূত হচ্ছে। নিউইয়র্ক সিটির বর্তমান মেয়র জোহরান মামদানি শহরের বিশাল বাজেট ঘাটতি মেটাতে ধনীদের ওপর চড়া কর আরোপের এক বৈপ্লবিক প্রস্তাব পেশ করেছেন। তার প্রস্তাবিত ‘টু-পাথ’ কৌশলের আওতায়, বছরে ১০ লাখ ডলারের বেশি আয় করা ব্যক্তিদের ওপর অতিরিক্ত ২ শতাংশ আয়কর এবং আবাসন খাতে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ প্রপার্টি ট্যাক্স বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। মেয়র মনে করছেন, ধনকুবেরদের এই অলস বিনিয়োগ থেকে শহর পরিচালনার জন্য ন্যায্য অংশ আদায় করা এখন সময়ের দাবি।
ম্যানহাটনের এই সুউচ্চ ভবনগুলো এখন এক অদ্ভুত সামাজিক বৈষম্যের সাক্ষী। একদিকে যখন সাধারণ নাগরিকদের জন্য শহরে সামান্য একটু আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে, তখন শহরের সবচেয়ে দামী জায়গার প্রতিটি বর্গফুট কেবল নামসর্বস্ব কোম্পানির মালিকানাধীন সম্পদ হিসেবে পড়ে আছে। বিপুল ব্যয়ে নির্মিত এই বিলাসবহুল আবাসনগুলো শেষ পর্যন্ত নগরের সৌন্দর্য বর্ধন করবে নাকি সাধারণ মানুষের কোনো কল্যাণে আসবে সেই প্রশ্নটিই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।