দেশের সামগ্রিক শ্রমশক্তির এক বিরাট অংশ এখনও অনানুষ্ঠানিক খাতের অধীনে রয়েছে, যা একটি টেকসই ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতি অর্জনের পথে বড় অন্তরায়। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় না আনা গেলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ‘কমপ্লায়েন্স’ এবং শ্রমিকদের প্রকৃত সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) ঢাকায় সিরডাপ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এই উদ্বেগের কথা জানান।
রাজধানীতে ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (টিসিসি) ৯৪তম এবং তৈরি পোশাক (আরএমজি) বিষয়ক ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (আরএমজি টিটিসি) ২২তম যৌথ সভায় তিনি এই জোরালো আহ্বান জানান। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, "তৈরি পোশাক বা আরএমজি খাতকে কেন্দ্র করে আমাদের শ্রমিকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ফরমাল সেক্টরে অন্তর্ভুক্ত হলেও দেশের সামগ্রিক চিত্র ভিন্ন। শ্রমশক্তির এক বিশাল অংশ আজও অনানুষ্ঠানিক খাতেই রয়ে গেছে, যা আমাদের অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।" তিনি বলেন, দেশকে একটি স্থিতিশীল অবস্থানে নিতে হলে পর্যায়ক্রমে সকল খাতের শ্রমিকদের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে খন্দকার মুক্তাদির বলেন, "নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রস্তুতিমূলক কাজ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় খুব শিগগির এই যুগান্তকারী কার্যক্রম শুরু হবে।" এই কর্মসূচির আওতায় প্রতি পরিবারকে একটি করে বিশেষ কার্ড দেওয়া হবে, যার মাধ্যমে তারা প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা মূল্যের সহায়তা পাবেন। তিনি যোগ করেন, "যদিও এটি সরাসরি রেশন ব্যবস্থা নয়, তবে এই কার্ডের মাধ্যমে রেশনের উদ্দেশ্য অনেকাংশেই পূরণ হবে, যা দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করবে।"
শিল্প ও শ্রম খাতে বিদ্যমান নানা সমস্যা সমাধানে নিয়মিত সংলাপের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, পারস্পরিক আলোচনা ও মতবিনিময় ছাড়া কোনো সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। শ্রম সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, যে মহান উদ্দেশ্য নিয়ে টিটিসি গঠন করা হয়েছে, সেই লক্ষ্য পূরণে অবশ্যই নিয়মিতভাবে এই মিটিং আয়োজন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, "আলোচনার টেবিলে তর্ক-বিতর্ক বা উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হতেই পারে, এটি গণতান্ত্রিক আলোচনার একটি স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর অংশ। এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ, একমাত্র খোলামেলা সংলাপের মাধ্যমেই দীর্ঘস্থায়ী সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব।"
শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নূরুল হক এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। এছাড়া বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের ফজলে হাসান শামিম এবং টিটিসির সহ-সভাপতি মো. আনোয়ার হোসেনও তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন।
সভায় দেশের সার্বিক শ্রম পরিস্থিতি, আরএমজি সেক্টরে চলমান শ্রম অসন্তোষ নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ ও ছুটি মঞ্জুর সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রহমান তরফদার। মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষের শীর্ষ নেতারাও সভায় উপস্থিত থেকে নিজ নিজ মতামত ব্যক্ত করেন।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।