ঢাকার সড়কে ২৫ হাজার 'চলমান ধ্বংসাবশেষ': যানজট নিরসনে এবার হার্ডলাইনে ডিএমপি

রাজধানী ঢাকার রাজপথ এখন যেন মেয়াদোত্তীর্ণ ও জরাজীর্ণ যানবাহনের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। সরকারি আইন অনুযায়ী বাণিজ্যিক পরিবহনের একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল বা ইকোনমিক লাইফ থাকলেও, বাস্তবে তার তোয়াক্কা করছেন না মালিকরা। ফলে ২০ থেকে ২৫ বছরের পুরনো এসব লক্কড়-ঝক্কড় বাস ও ট্রাক ঢাকার যানজট পরিস্থিতিকে ঠেলে দিচ্ছে চরম বিপর্যয়ের দিকে। এমন প্রেক্ষাপটে জনভোগান্তি কমাতে এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এসব অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে বিশেষ সাঁড়াশি অভিযানের ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।


সরকারের নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী, একটি বাণিজ্যিক বাসের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক আয়ু ২০ বছর এবং ট্রাকের জন্য এই সময়সীমা ২৫ বছর। এই নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পর ওই যানবাহনের রাস্তায় চলাচলের কোনো আইনি বৈধতা থাকে না। তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে এক ভয়াবহ তথ্য। শুধুমাত্র ঢাকা মহানগরীতেই বর্তমানে ২৫ হাজারেরও বেশি বাস ও ট্রাক রয়েছে, যেগুলোর নির্ধারিত আয়ু অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।


বিআরটিএর জুন ২০২৪ পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঢাকা মহানগরে ২০ বছর বা তার বেশি বয়সী বাসের সংখ্যা ৮ হাজার ১৩২টি এবং মিনিবাসের সংখ্যা ৬ হাজার ৪৭৮টি। ঢাকা জেলা ও মহানগর মিলিয়ে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ হাজার ৫৫৬টিতে। এর বাইরে সারা দেশে আরও ১৮ হাজার ২০৫টি বাস ও মিনিবাস রয়েছে যা নির্ধারিত বয়সসীমা অতিক্রম করেছে। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মতে, এসব বাসের একটি বড় অংশেরই কোনো বৈধ রুট পারমিট নেই, তবুও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এগুলো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাজপথ।


পণ্যবাহী যানবাহনের চিত্রও সমান উদ্বেগজনক। ঢাকা মহানগর ও জেলায় ২৫ বছরের পুরনো ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও ট্যাংকলরির সংখ্যা ১৪ হাজার ৬৮৩টি। সারা দেশে এই ক্যাটাগরির মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের মোট সংখ্যা ৩১ হাজার ৭৯৮টি। সব মিলিয়ে বর্তমানে দেশের সড়কে প্রায় ৭৫ হাজারেরও বেশি মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন চলাচল করছে, যা আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এসব পুরনো গাড়ি মাঝরাস্তায়, বিশেষ করে ফ্লাইওভার ও সংকীর্ণ সেতুর ওপর বিকল হয়ে পড়ায় নিমিষেই তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এছাড়া বিষাক্ত কালো ধোঁয়া নির্গমনের মাধ্যমে এগুলো পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহন শুধু যানজটই বাড়াচ্ছে না, বরং বড় ধরনের সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনারের পক্ষ থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি জারি করা হয়েছে। জানানো হয়েছে, এখন থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ ও চলাচলের অনুপযোগী যানবাহনের বিরুদ্ধে কোনো নমনীয়তা দেখানো হবে না। বিশেষ অভিযানের আওতায় লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি দেখলেই মোটা অঙ্কের জরিমানা, সরাসরি ডাম্পিং স্টেশনে প্রেরণ এবং স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও ট্রাফিক পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং জনদুর্ভোগ লাঘবে যানবাহন মালিক ও চালকদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ডিএমপি। এই অভিযান সফল হলে ঢাকার যানজট পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।