বরেন্দ্রর গভীরে অশনিসংকেত: ‘মৃত’ অ্যাকুইফার আর পানিশূন্য মাটির নিচে কি কেবলই হাহাকার?

রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিস্তীর্ণ বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে এখন এক দীর্ঘশ্বাসের নাম ‘পানি’। একসময়ের টইটম্বুর পুকুরগুলো আজ পরিত্যক্ত ডোবায় পরিণত হয়েছে, আর বাড়ির উঠানের নলকূপগুলো হয়ে পড়েছে অকেজো। যে গভীর নলকূপের ওপর নির্ভর করে বিঘার পর বিঘা জমিতে ধান চাষ হতো, সেখানে এখন পানির বদলে কেবল বাতাস বা কাদা উঠে আসছে। গবেষকরা সতর্ক করে বলছেন, নির্বিচারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে মাটির নিচের প্রাকৃতিক পানিধারক স্তর বা ‘অ্যাকুইফার’ কার্যত মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। ফলে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হলেও মাটির অভ্যন্তরে আর রিচার্জ বা পানি জমা হচ্ছে না। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পাশাপাশি কয়েক লাখ মানুষের সুপেয় পানির অধিকারও আজ হুমকির মুখে।


পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে গত বছরের ২৫ আগস্ট সরকার রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর ২৫টি উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৪৬৯টি মৌজাকে ‘অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এছাড়া ৮৮৪টি মৌজাকে ‘উচ্চ’ এবং ১ হাজার ২৪০টি মৌজাকে ‘মধ্যম’ মাত্রার সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। গত জানুয়ারিতে জারি করা এক সরকারি প্রজ্ঞাপনে এসব এলাকায় খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য যেকোনো উদ্দেশ্যে নতুন নলকূপ স্থাপন ও পানি তোলা নিষিদ্ধ করে ১১টি কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। তবে ‘দেশ মিডিয়া’র সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাঠপর্যায়ে এই নিষেধাজ্ঞার ছিটেফোঁটাও কার্যকর নেই।


রাজশাহীর তানোর উপজেলার উচ্চাডাঙ্গা গ্রামের ৮৪ বছর বয়সী বৃদ্ধ তাজমুল হক তার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আগে আমরা পুকুরের পানি খেতাম, কিন্তু পুকুরগুলো সব নষ্ট হয়ে গেছে। সরকার ১ হাজার ৪০০ ফুট গভীরেও টিউবওয়েল বসিয়ে পানি পায়নি। এখন তিনটি জায়গায় বিশেষ পাম্প বসিয়ে কোনোমতে গাঁয়ের মানুষ তেষ্টা মেটাচ্ছে। এই পানি ফুরালে আমাদের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না।’ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ঘোষিত সংকটাপন্ন এলাকার প্রায় ২ হাজার ৭৮৭ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বসবাসরত ২১ লাখ ৫ হাজার মানুষ এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে ভুগছেন।


সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বরেন্দ্র এলাকাকে পানিসংকটাপন্ন ঘোষণা করা আমাদের জন্য ছিল এক বাধ্যতামূলক পদক্ষেপ। আমরা ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরন নিশ্চিত করতে একটি প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছি। সরকার দ্রুত এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করলে কৃষকরা বেশি পানিনির্ভর ধান চাষ থেকে সরে এসে কম পানিনির্ভর শস্য চাষে উৎসাহিত হবেন।’ তিনি আরও সতর্ক করেন যে, শিল্পসমৃদ্ধ গাজীপুরেও একই ধরনের বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।


সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সংকটাপন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর শিল্প স্থাপন বা খাস জলাশয় ইজারা দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এমনকি আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে সেচকাজ পরিচালনা করা আইনত দণ্ডনীয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তানোরের নারায়ণপুর মৌজার মতো অতি উচ্চ সংকটাপন্ন এলাকাগুলোতেও অনেকে ঘরের দেয়াল ছিদ্র করে সাবমারসিবল পাম্পের পাইপ বের করে জমিতে সেচ দিচ্ছেন। পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ মাঝে মাঝে জরিমানা করলেও তা পানি উত্তোলন বন্ধে ব্যর্থ হচ্ছে। তানোরের মুণ্ডুমালা পৌর এলাকায় ব্যবসায়ী জহুরুল ইসলামের মালিকানাধীন একটি পরিত্যক্ত চালকলের মিটার ব্যবহার করে প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে বোরো চাষ করা হচ্ছে। যদিও জহুরুল ইসলামের দাবি, তিনি প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই এই কাজ করছেন।


ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৮৫-৮৬ সালে বিএডিসি (BADC) এবং পরবর্তীতে ১৯৯৩ সাল থেকে বিএমডিএ (BMDA) বরেন্দ্র অঞ্চলে গভীর নলকূপের মাধ্যমে সেচ কার্যক্রম শুরু করে। শুরুতে ১১ হাজার ৪০০টি গভীর নলকূপের সীমা থাকলেও বর্তমানে সেখানে ৬২ হাজার শ্যালো টিউবওয়েল ও ৪ হাজার গভীর নলকূপ চলছে। এই বিপুল সংখ্যক পাম্প মাটির নিচের পানিকে শুষে নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাটির নিচের যে বালু পানি ধরে রাখত, তা এখন পানি হারিয়ে ধুলায় পরিণত হয়েছে। ফলে পানির স্তর আর আগের অবস্থায় ফিরছে না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, অতি দ্রুত ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বিকল্প উৎস খুঁজে বের না করলে বরেন্দ্র অঞ্চল এক মহাবিপর্যয়ের মুখে পড়বে।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।