২ শতাংশ জমা দিলেই নিয়মিত হবে খেলাপি ঋণ; ব্যবসায়ীদের জন্য বড় ‘প্যাকেজ’ ঘোষণা বাংলাদেশ ব্যাংকের

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় সচল করতে এক বড় ধরনের নীতিসহায়তা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নানাবিধ সংকটে পড়া শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য এই বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, মাত্র ২ শতাংশ অর্থ ডাউন পেমেন্ট বা এককালীন জমা দিয়েই খেলাপি হয়ে পড়া ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ পাবেন ব্যবসায়ীরা।

গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, যেসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, কেবল তারাই এই সুবিধার আওতায় আসবে। তবে শর্ত হিসেবে জানানো হয়েছে, যারা এর আগে কোনো বিশেষ নীতিসহায়তা বা প্যাকেজের আওতায় ঋণ নিয়মিত করেছিলেন, তারা নতুন করে এই সুযোগটি পাবেন না। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে আবেদন করতে হবে এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে আবেদনের তিন মাসের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে হবে।

এই পুনর্গঠিত ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ ১০ বছর, যার মধ্যে প্রথম দুই বছর কোনো কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না—যাকে বলা হচ্ছে ‘গ্রেস পিরিয়ড’। একইভাবে কোনো গ্রাহক যদি চান তবে এক বছরের মধ্যে পুরো ঋণ এককালীন পরিশোধ করতে পারবেন, যার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পৃথক কোনো অনাপত্তির প্রয়োজন হবে না। তবে পূর্ণ ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট গ্রাহক বিদ্যমান ঋণের বাইরে নতুন কোনো ক্রেডিট সুবিধা বা ঋণ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন না।

দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং শিল্প খাতের উৎপাদনশীলতা পুনরুদ্ধারে এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বন্ধ কলকারখানাগুলো পুনরায় চালুর মাধ্যমে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থানের যে মেগা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, এটি তারই একটি কৌশলগত অংশ। ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, এককালীন জমা দেওয়া অর্থ ব্যাংকে প্রকৃত জমা হওয়ার আগে নীতিসহায়তার আবেদন কার্যকর হবে না।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখন ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। কিন্তু গত সাড়ে ১৫ বছরের অনিয়ম, জালিয়াতি এবং এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো ও বিসমিল্লাহ গ্রুপের মতো নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর অনাচারের ফলে ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকায়। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন এই নীতিমালার ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে আসার পাশাপাশি স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতিতে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।