দুর্বল ‘রেগুলেটর’ আর অনিষ্পন্ন দাবির বোঝা: খাদের কিনারায় দেশের বীমা শিল্প

দুর্বল ‘রেগুলেটর’ আর অনিষ্পন্ন দাবির বোঝা: খাদের কিনারায় দেশের বীমা শিল্প

বাংলাদেশের অর্থনীতি বা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলেও সেই গতির সাথে তাল মেলাতে চরমভাবে হিমশিম খাচ্ছে দেশের বীমা খাত। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় জিডিপির তুলনায় বীমা খাতের প্রিমিয়াম আয় এখনও ১ শতাংশের কোটা পার করতে পারেনি। খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং নির্দিষ্ট সময়ে গ্রাহকদের বীমা দাবি পরিশোধ না করার ফলেই এই সম্ভাবনাময় শিল্পটি এখন বিশাল আস্থার সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে। পরিস্থিতি উত্তরণে একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন এবং আমূল সংস্কার এখন সময়ের দাবি।


বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। তথ্যমতে, সাধারণ বীমা বা ‘নন-লাইফ’ খাতে উত্থাপিত বীমা দাবির প্রায় ৯১.৭০ শতাংশই এখনো অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে আছে। ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিক (এপ্রিল-জুন) শেষে দেখা যায়, নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর কাছে গ্রাহকদের পাওনা বা দাবির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৬০৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এর বিপরীতে কোম্পানিগুলো নিষ্পত্তি করেছে মাত্র ৩০০ কোটি ১ লাখ টাকা। অর্থাৎ বিশাল অংকের টাকা এখনো গ্রাহকদের নাগালের বাইরে।


জীবন বীমা বা ‘লাইফ ইনস্যুরেন্স’ খাতের পরিস্থিতিও সমানভাবে উদ্বেগজনক। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর বকেয়া দাবির পরিমাণ ৩ হাজার কোটি টাকার মাইলফলক ছাড়িয়ে গেছে। ওই সময়ে দেশের ৩৬টি জীবন বীমা কোম্পানিতে মোট ৫ হাজার ৯৮৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকার দাবি উত্থাপিত হলেও পরিশোধ করা হয়েছে মাত্র ২ হাজার ১০৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ফলে বকেয়া রয়ে গেছে ৩ হাজার ৮৮০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। শতাংশের হিসেবে মাত্র ৩৫ শতাংশ দাবি মেটানো হয়েছে, আর ৬৫ শতাংশই এখনো ঝুলে আছে।


অভিযোগ রয়েছে, এই অপরিশোধিত অর্থের সিংহভাগই আটকে আছে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি কোম্পানিতে। কয়েকটি দুর্বল কোম্পানির ক্রমাগত অনিয়ম ও দায় এড়ানোর প্রবণতার কারণে পুরো বীমা শিল্পের ভাবমূর্তি আজ তলানিতে ঠেকেছে। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ মনে করেন, প্রয়োজনের তুলনায় দেশে বীমা কোম্পানির সংখ্যা অনেক বেশি। অনেক কোম্পানি গ্রাহকের সাথে প্রতারণা করছে এবং সময়মতো দাবি পরিশোধ না করায় মানুষের আস্থা শূন্যের কোঠায় নেমেছে। এ অবস্থায় ‘আইডিআরএ’-কে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।


আইডিআরএ-র চেয়ারম্যান ড. এম আসলাম আলম এই আস্থাহীনতার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ২০১০ সাল থেকে গত ১৪ বছরে কেবল জীবন বীমাতেই ৫৪ লাখ পলিসি কমেছে। ২০২৪ সালের শেষে চলমান পলিসির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭১ লাখে। তিনি জানান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আইন ও বিধি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শহিদুল ইসলাম জাহীদ বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আইডিআরএ এখনো আর্থিক স্বাধীনতা পায়নি এবং সেখানে ‘প্রফেশনাল’ জনবলেরও ঘাটতি রয়েছে। বীমা সংশ্লিষ্টরা পরামর্শ দিয়েছেন যে, যেসব কোম্পানি গ্রাহকের টাকা দিতে পারছে না, তাদের নতুন পলিসি ইস্যু করার সুযোগ বন্ধ রাখা উচিত। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা উন্নয়নশীল দেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী বীমা খাত তৈরি করা এখন বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।