মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও যুদ্ধাবস্থা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষক ও অর্থনীতিবিদরা। তারা সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানিসংকট ও মূল্যবৃদ্ধি অনিবার্য। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের ওপর, যার ফলে সরকারের ঋণ ও জ্বালানি ভর্তুকির বোঝা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। কারণ, দেশের মোট প্রাথমিক জ্বালানির ৬৩ শতাংশই আমদানিনির্ভর। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘ মেয়াদে এই যুদ্ধাবস্থা অব্যাহত থাকলে দেশের পরিবহন খাত, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, রপ্তানি আয় এবং প্রবাসী আয়ে (রেমিট্যান্স) বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। উদ্ভূত এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে কঠোর কৃচ্ছ্রতা সাধনের বিকল্প নেই বলে মত দিয়েছেন তারা। প্রয়োজনে দেশের অনুৎপাদনশীল খাতগুলোতে সুনির্দিষ্টভাবে ‘লোডশেডিং’ দেওয়ার মতো কঠিন পরামর্শও এসেছে তাদের কাছ থেকে।
আজ রোববার (১৫ মার্চ) সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে ‘ইরান যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে প্রভাব’ শীর্ষক এক বিশেষ আলোচনা সভায় অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা এসব গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেন। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সময়োপযোগী এই আলোচনা অনুষ্ঠানের যৌথ আয়োজক ছিল গবেষণা সংস্থা ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ এবং ‘পলিসি এক্সচেঞ্জ’। সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর। সভায় মূল প্রবন্ধ ও আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ।
জ্বালানি খাতের অব্যবস্থাপনা নিয়ে কড়া সমালোচনা করে এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘বিগত ২০ বছর ধরে দেশে নতুন কোনো গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর ফলে পরিকল্পিতভাবে দেশকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা ‘এলএনজি’ (LNG) নির্ভর করে তোলা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভুলপথে চলা এই জ্বালানি নীতি এখন পুরোপুরি ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে।’ তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ‘আমাদের দেশে ব্যবহৃত মোট জিজেলের ৬৩ শতাংশই ব্যয় হয় পরিবহন খাতে। গালফ বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকেই আমরা আমাদের চাহিদার ৮০ শতাংশ ক্রুড ওয়েল (অশোধিত তেল) আমদানি করে থাকি। বর্তমানে কাতার এলএনজি উৎপাদন বন্ধ রাখায় বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম এক ধাক্কায় ৬৩ শতাংশ বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি ও ভয়াবহ প্রভাব পড়বে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায়।’
রপ্তানি খাতের ওপর আসন্ন সংকটের প্রভাব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এম মাসরুর রিয়াজ আরও জানান, বিশ্ববাজারে ইতিমধ্যে পণ্য জাহাজীকরণের ভাড়া ৩০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বর্ধিত ভাড়ার কারণে বাংলাদেশ থেকে কোনো পণ্য আমদানি করতে গেলে বিদেশি ক্রেতাদের প্রতি ইউনিটে ১০ থেকে ১৫ সেন্ট বাড়তি খরচ গুনতে হবে। এর ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশ থেকে পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানির আদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ কমলে রিজার্ভের ওপর যে চাপ তৈরি হবে, তা সামলানো কঠিন হবে। বাড়তি জ্বালানি ভর্তুকি মেটানো সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এমন অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন কোনো ‘পে-স্কেল’ বা বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই বলেও তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন।
সভায় জ্বালানিবিষয়ক গবেষক শফিকুল আলম দেশের জ্বালানি অর্থনীতির নাজুক চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘প্রতি বছর আমাদের প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল অঙ্কের জ্বালানি আমদানি করতে হয়। যেহেতু আমাদের পুরো জ্বালানি খাতটাই আমদানিনির্ভর, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম সামান্য বাড়লেও আমাদের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়।’ তিনি জানান, বর্তমানে দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ২০ শতাংশ আসে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম মাত্র ১০ শতাংশ বাড়লেও দেশে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ১ টাকা ৬০ পয়সা বেড়ে যায়। এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে সরকার আগামী এক বছরের মধ্যে ১ থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে বলে তিনি পরামর্শ দেন।
প্রয়োজনে লোডশেডিংয়ের পরামর্শ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান অবস্থাকে ‘জ্বালানি দুর্ভিক্ষ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার ম্যাগাজিনের সম্পাদক মোল্লা এম আমজাদ হোসেন। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘দেশে রীতিমতো জ্বালানি দুর্ভিক্ষের মতো একটি ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়েছে। এই নির্দিষ্ট খাতেই সরকারের কাঁধে ইতিমধ্যে ৫ বিলিয়ন বা ৫০০ কোটি ডলারের বিশাল দায় চেপে আছে।’ পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রয়োজনে এখনই অনুৎপাদনশীল খাতগুলোতে দৈনিক তিন ঘণ্টা করে ‘লোডশেডিং’ করার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারে সরকার।
ভয়েস ফর রিফর্মের সদস্য সৈয়দ হাসিব উদ্দিন একটি উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ‘সরকারের প্রতি ১০০ টাকা আয়ের মধ্যে ২৯ টাকাই চলে যাচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধ করতে, আর ২১ টাকা ব্যয় হচ্ছে ভর্তুকি মেটাতে। নতুন সরকার যদি সবার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে চায়, তবে সরকারের ঋণ ও ভর্তুকি ব্যয় আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে। তাই সরকারকে এখন কোনো রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের চেয়ে বাস্তবতার নিরিখে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দেশের স্বার্থে সবাই মিলে আমরা কৃচ্ছ্রতা সাধনে রাজি আছি।’
এ প্রসঙ্গে সঞ্চালক ও ভয়েস ফর রিফর্মের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, কৃচ্ছ্রতা সাধনের জন্য এই মুহূর্তে একটি সুদৃঢ় জাতীয় ঐকমত্য দরকার। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে বিদ্যমান ঐকমত্য যেন সংকটের মুখে না পড়ে, নীতিনির্ধারক ও সরকারকে সেদিকে তীক্ষ্ণ খেয়াল রাখতে হবে।
স্থগিত হচ্ছে রপ্তানি আদেশ আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ দেশের তৈরি পোশাক ও রপ্তানি খাতের জন্য অশনিসংকেত দিয়ে জানান, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের অনেক রপ্তানি আদেশ ‘হোল্ড’ বা স্থগিত করতে শুরু করেছেন। তিনি এর পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘ক্রেতা দেশগুলোতে বর্তমানে খাদ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে, যার ফলে পোশাকের মতো পণ্যের চাহিদা কমছে। তাই সামনের দিনগুলোতে রপ্তানি আদেশ আরও আশঙ্কাজনক হারে কমে যেতে পারে। আমাদের পোশাক খাত এমনিতেই খুব একটা ভালো অবস্থায় ছিল না, এখন এই বিশ্বযুদ্ধ পরিস্থিতি পুরো খাতটিকে আরও নাজুক ও খাদের কিনারায় ঠেলে দিচ্ছে।’ বিকল্প বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে তিনি ভারতের সঙ্গে স্থলবন্দরগুলো দ্রুত ও পুরোপুরি চালু করার জন্য সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানান।
উক্ত গুরুত্বপূর্ণ এই আলোচনা সভায় অন্যান্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ সংগঠন বায়রার সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী, পুঁজিবাজারের অংশীজন আসিফ খান এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক গবেষক সাহাব এনাম খান।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।