ঢাকা শহরের চিরচেনা সেই ভোরের পাখির কলকাকলি এখন কেবলই স্মৃতি। এক দশক আগেও রাজধানীর আকাশ জুড়ে অগণিত কাকের যে মেলা দেখা যেত, তা এখন সংখ্যায় এতটাই কমেছে যে চাইলে গণনা করা সম্ভব। কেবল কাক নয়, নগরায়ণের তীব্র চাপে ঢাকা থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার পথে বহু প্রজাতির পাখি। সাম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্যমতে, প্রতিকূল পরিবেশ ও আশঙ্কাজনক হারে প্রজনন ক্ষমতা কমে যাওয়ায় দেশের প্রধান শহরগুলো থেকে ইতোমধ্যে ২৫ শতাংশ পাখির বৈচিত্র্য হারিয়ে গেছে।
গবেষকরা জানাচ্ছেন, মূলত বায়ুদূষণ, গাছপালা কমে যাওয়া এবং জলাশয় ভরাটের কারণে পাখিরা চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। বিশেষ করে বায়ুদূষণ পাখির ফুসফুস ও শ্বসনতন্ত্রের ক্ষতি করার পাশাপাশি তাদের হরমোন ব্যবস্থায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। এতে তাদের বংশবৃদ্ধির হার আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত দুই বছরব্যাপী এক গবেষণায় এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
দেশের পাঁচটি বড় শহর-ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনার ২৩৮ প্রজাতির ৩ হাজার ৬০১টি পাখির জীবন ও বিচরণ পর্যবেক্ষণ করেছেন গবেষকদল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফিরোজ জামানের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় নগর এলাকাকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, অতিমাত্রায় নগরায়িত এলাকাগুলোতে, যেখানে সবুজায়ন ও জলাশয় নেই বললেই চলে, সেখানে পাখির বৈচিত্র্য সবচেয়ে কম। মধ্যম ও নিম্ন নগরায়িত এলাকার তুলনায় উচ্চ ঘনত্বের এই এলাকাগুলোতে পাখির প্রজাতি উপস্থিতির হার ২৫ শতাংশ কম পাওয়া গেছে।
তথ্যমতে, উচ্চ নগরায়িত এলাকায় মাত্র ১৩৬টি প্রজাতির পাখির দেখা মিলেছে। অথচ মধ্যম ও কম নগরায়িত এলাকায় যথাক্রমে ১৮৫ ও ১৮৩টি প্রজাতির বিচরণ রয়েছে। অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফিরোজ জামান জানান, ‘আমরা দেখেছি রাজ ঘুঘু, চন্দনা টিয়া, শঙ্খচিল, শামুকখোল, রাতচোরা ও কোয়েলের মতো পাখিগুলো উচ্চ নগরায়িত এলাকা থেকে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। নগরের তীব্র চাপে তারা বংশবৃদ্ধি করতে না পেরে এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে।’
গবেষণায় দেখা গেছে, রাজশাহী শহরে সর্বোচ্চ ১৬৭ প্রজাতির পাখির দেখা মিলেছে। এর পরই ১৬০ প্রজাতি নিয়ে ঢাকার অবস্থান। তবে গবেষকদের মতে, প্রজাতি বেশি থাকলেও এই দুই শহরের পাখিরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। বায়ুদূষণের ক্ষুদ্র কণা (পিএম ২.৫) এবং ভারী ধাতু যেমন সিসা ও পারদ পাখির রক্তে মিশে তাদের প্রজনন সক্ষমতা ধ্বংস করছে। এছাড়া অ্যাসিড বৃষ্টির প্রভাবে মাটিতে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হওয়ায় পাখিরা পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছে না, যার ফলে তাদের ডিমের খোসা পাতলা ও ভঙ্গুর হয়ে যাচ্ছে। এতে বাচ্চা ফোটার আগেই ডিম নষ্ট হয়ে যাওয়ার হার বেড়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম মনিরুল এইচ খান বলেন, ‘মানুষের মতো পাখিরও দূষণ সহ্য করার একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। বিষাক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ায় পাখির ছানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া দূষণে পোকামাকড় কমে যাওয়ায় পতঙ্গভুক পাখিরা খাদ্যসংকটে পড়ে শহর ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।’
নগরের এই বিপর্যস্ত বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) নতুন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, ঢাকা মহানগরীর জন্য বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) পাঁচটি আঞ্চলিক পার্ক নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। রমনা ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের আদলে এই বিশাল সবুজ এলাকাগুলো গড়ে তোলা সম্ভব হলে পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল ও প্রজনন পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল পরিকল্পনা নয়, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে অদূর ভবিষ্যতে নগরের আকাশ পুরোপুরি পক্ষীশূন্য হয়ে পড়তে পারে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।