বিশ্বকাপ ফুটবলের আঙিনায় আর্জেন্টিনা যতবারই জয়ের পতাকা ওড়ায়, সমান্তরালভাবে পিছু ছাড়ে না একরাশ বিতর্ক। ২০২৬ বিশ্বকাপেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই একটি বিশেষ গুঞ্জন ফুটবল বিশ্বে ‘ভাইরাস’-এর মতো ছড়িয়ে পড়েছে— ‘আর্জেন্টিনাকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে ফিফা’, ‘বিশ্বকাপের চিত্রনাট্য আগে থেকেই সাজানো’, কিংবা ‘লিওনেল মেসিকে চ্যাম্পিয়ন করতেই মাঠের কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রটোকল’! দীর্ঘদিনের এই নিভৃত আলোচনা এবার প্রকাশ্য রূপ নেওয়ায় অবশেষে নীরবতা ভেঙেছেন খোদ আর্জেন্টাইন জাদুকর। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর সেমিফাইনাল জয়ের পর সমালোচকদের কঠোর ভাষায় ধুয়ে দিয়েছেন এই মহাতারকা।
চলমান আসরে আলজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির সেই আলোচিত ‘স্টাডস-আপ’ ট্যাকল থেকে শুরু করে মিসর ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে নকআউট ম্যাচে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)-এর কয়েকটি সূক্ষ্ম সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। অনেক ফুটবল বোদ্ধা ও সমর্থকদের দাবি, রেফারির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত নীল-সাদা শিবিরের পক্ষেই যাচ্ছে। তবে আটলান্টার মাঠে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে পরাজিত করে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করার পর সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত মারমুখী ভঙ্গিতে হাজির হন মেসি।
আবেগময় ও পেশাদার ঢঙে মেসি বলেন, ‘যাদের মনে কষ্ট লাগে, তারা কষ্ট পেতে থাকুক। গত চারটি বছর ধরে আমরাই যে বিশ্বের সেরা দল— মানুষ যা-ই বলুক না কেন, মাঠের পারফরম্যান্স সেই সাক্ষ্য দেয়। আবারও আমরা বিশ্বের সেরা দুটি দলের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছি। এটিই প্রমাণ করে যে আমাদের এই অবিশ্বাস্য সাফল্য কোনো কাকতালীয় বিষয় নয় কিংবা কেউ আমাদের ট্রফিটি উপহার হিসেবে দেয়নি। ফুটবল ইতিহাসে টানা দুটি বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা বিরল এক রেকর্ড, যা আমরা আমাদের সামর্থ্য দিয়ে অর্জন করেছি।’
আটলান্টার সেই স্নায়ুক্ষয়ী সেমিফাইনালে এক সময় হারের শঙ্কায় ছিল আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে পিছিয়ে পড়ায় আলবিসেলেস্তে শিবিরে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। তবে ঠিক সেই মুহূর্তেই জ্বলে ওঠেন অধিনায়ক মেসি। তাঁর দুটি নিখুঁত ‘অ্যাসিস্ট’ থেকে গোল করে ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেন এনজো ফার্নান্দেজ ও লাউতারো মার্তিনেজ। ২-১ ব্যবধানের এই নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের পর মেসি আরও যোগ করেন, ‘আমরা যদি আজ হেরে যেতাম, তবে অনেকেই অনেক সস্তা কথা বলার সুযোগ পেত। কিন্তু আমরা সেই সুযোগ দিইনি। আমরা জানতাম মাঠের লড়াইয়ে আমরাই শ্রেষ্ঠ।’
বিজয়োল্লাসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে মেসি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন ফুটবল ঈশ্বর দিয়েগো ম্যারাডোনাকেও। ১৯৮৬ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনার সেই ঐতিহাসিক লড়াইয়ের স্মৃতি টেনে মেসি বলেন, ‘নিঃসন্দেহে দিয়েগো আজ স্বর্গ থেকে এই জয় উপভোগ করছেন। আজকের দিনটি তাঁর জন্য অত্যন্ত আবেগের ছিল। এই জয়টি আসলে ম্যারাডোনার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ উপহার।’
রেফারিং কিংবা মাঠের বাইরের বিতর্ক যা-ই হোক না কেন, মেসির এই দৃঢ়চেতা বক্তব্য তাঁর দলের আত্মবিশ্বাসকেই ফুটিয়ে তুলেছে। এখন বিশ্ববাসীর নজর আগামী রোববারের সেই গ্র্যান্ড ফাইনালের দিকে, যেখানে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে অপ্রতিরোধ্য স্পেন। ফুটবল বিশ্ব এখন একটি ঐতিহাসিক ‘ডেডলাইন’-এর অপেক্ষায়, যেখানে মেসি তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শেষলগ্নে আরও একটি বিশ্বজয়ের মহাকাব্য লিখতে পারেন কি না, সেটিই দেখার বিষয়।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।