বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে আরও একটি মহাকাব্যিক রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের সাক্ষী হলো আটলান্টার ফুটবল অনুরাগী জনতা। টুর্নামেন্টের বহুল প্রতীক্ষিত সেমিফাইনালে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে জয়ের একেবারে দোড়গোড়ায় গিয়েও মাত্র কয়েক মিনিটের চরম নাটকীয়তায় স্তব্ধ হয়ে গেল ইংল্যান্ডের সোনালী স্বপ্ন। ম্যাচের সিংহভাগ সময় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তের ‘প্যাকেজ’ কৌশলের ভুলে থ্রি লায়ন্সদের পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে। অন্যদিকে, খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে নাম লিখিয়েছে লিওনেল মেসির দল।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই পরাশক্তির মধ্যে ছিল স্নায়ুক্ষয়ী লড়াই। প্রথমার্ধ ছিল মূলত রক্ষণভাগের দৃঢ়তা আর শারীরিক শক্তিমত্তার প্রদর্শনী। আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা বারংবার চেষ্টা করলেও গোলমুখে বড় কোনো সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হন। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রথমার্ধে ইংল্যান্ডের ‘এক্সপেক্টেড গোলস’ (xG) ছিল মাত্র ০.০৫ এবং আর্জেন্টিনার ছিল ০.০৩। গোলশূন্য প্রথমার্ধের পর বিরতি থেকে ফিরেই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে ইংলিশরা। ম্যাচের ৫৫তম মিনিটে মর্গান রজার্সের এক নিখুঁত ক্রস থেকে লক্ষ্যভেদ করে দলকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন অ্যান্থনি গর্ডন। উল্লেখ্য, এই উদীয়মান তারকা বিশ্বকাপ শেষেই স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনায় যোগ দেওয়ার চূড়ান্ত চুক্তিতে সই করেছেন।
গর্ডনের এই গোলের পর মাঠের পরিস্থিতি পুরোপুরি ইংল্যান্ডের অনুকূলে ছিল। আর্জেন্টিনার দুই প্রধান ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো আগেই হলুদ কার্ড পাওয়ায় তারা কিছুটা রক্ষণাত্মক হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ব্যবধান বাড়ানোর পরিবর্তে ম্যানেজার থমাস টুখেল অতি-রক্ষণাত্মক হওয়ার ‘ডেডলাইন’ বেছে নেন। ৭২তম মিনিটে গোলদাতা গর্ডনকে তুলে নিয়ে তিনি ডিফেন্ডার এজরিল কোনসাকে মাঠে নামান। ৮২তম মিনিটে আরও দুই অভিজ্ঞ খেলোয়াড় রিস জেমস ও ডেক্লান রাইসকে তুলে নিয়ে ড্যান বার্ন ও ওরাইলিকে নামিয়ে বক্সের সামনে ‘বাস পার্ক’ করার নীতি গ্রহণ করেন টুখেল।
বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের আক্রমণের সুযোগ দিলে তার মাশুল যে দিতে হয়, ৮৫ মিনিটে তার প্রমাণ মেলে। অধিনায়ক লিওনেল মেসির এক বুদ্ধিদীপ্ত শর্ট কর্নার থেকে বল পেয়ে বক্সের বাইরে থেকে বুলেট গতির শটে সমতা ফেরান এনজো ফার্নান্দেজ। মাঠের এই অস্থিরতা যখন টাইব্রেকারের দিকে গড়াচ্ছিল, তখনই ৯২ মিনিটে আবারও জাদুকরী ছোঁয়া দেখান মেসি। তাঁর চমৎকার ক্রস থেকে নিখুঁত হেডে জয়সূচক গোলটি করেন লাউতারো মার্তিনেজ।
‘অপটা’র চাঞ্চল্যকর তথ্য অনুযায়ী, গর্ডনের গোলের পর থেকে ম্যাচের শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের পায়ে বলের দখল ছিল মাত্র ১২ শতাংশ। অর্থাৎ বাকি সময়টা তারা স্রেফ আর্জেন্টিনার আক্রমণের স্রোত ঠেকানোর নিষ্ফল চেষ্টা করেছে। ম্যাচ শেষে অধিনায়ক হ্যারি কেইন আক্ষেপ করে বলেন, "এই স্তরের ফুটবলে কেবল গোল ধরে রাখার মানসিকতা রাখাটা এক বড় ভুল।" এই পরাজয়ের ফলে ইংল্যান্ডকে এখন তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ফ্রান্সের মুখোমুখি হতে হবে, আর শিরোপা রক্ষার লড়াইয়ে স্পেনের মোকাবিলা করবে আর্জেন্টিনা।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।