ইরান-ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধের তীব্র উত্তেজনায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, তা সামাল দিতে এক অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। নিজেদের আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও, সাময়িকভাবে বিভিন্ন দেশকে রাশিয়ার জ্বালানি তেল কেনার অনুমোদন দিয়েছে দেশটি, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে এই অনুমোদন ঢালাওভাবে সকলের জন্য প্রযোজ্য নয়। মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বিষয়টি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, শুধুমাত্র সেইসব দেশ এই সুযোগ পাবে, যারা ইতোমধ্যে রাশিয়ার তেল বা পেট্রোলিয়াম পণ্য জাহাজে লোড করেছে এবং সেইসব জাহাজ বর্তমানে ট্রানজিটে অর্থাৎ মাঝসমুদ্রে রয়েছে। এই সীমিত ও স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপটি আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। স্কট বেসেন্ট বলেন, "যুদ্ধের আবহে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই এই সাময়িক ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য। এই পদক্ষেপটি শুধুমাত্র সমুদ্রে পরিবহনরত তেলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, ফলে এটি রাশিয়া সরকারের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো আর্থিক সুবিধা তৈরি করবে না।"
এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপট হলো ইরান যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে সৃষ্ট সংকট। সম্প্রতি বিভিন্ন বাণিজ্যিক নৌযান ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার ঘটনা এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশই এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার উপসাগরে তিনটি কার্গো জাহাজে হামলার খবরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার অতিক্রম করেছে। এর সাথে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার কঠোর অঙ্গীকার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
জ্বালানি তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) তাদের কৌশলগত মজুত থেকে রেকর্ড ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। এদিকে, উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল আমদানিকারক এশিয়ার বিভিন্ন দেশও সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় জরুরি প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ফিলিপাইন, যার মোট আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৯৫ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে, জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সপ্তাহে চার দিন অফিস করার নির্দেশনা জারি করেছে। একইভাবে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো অভ্যন্তরীণ বাজারে পেট্রোলের দামের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে।
মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আরও যোগ করেন, তেলের দামের এই আকস্মিক বৃদ্ধি একটি স্বল্পমেয়াদি সংকট হলেও, দীর্ঘ মেয়াদে এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। তিনি আশ্বাস দেন, পরিস্থিতি অনুকূলে এলেই যুক্তরাষ্ট্র সরকার হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে সামরিক নিরাপত্তা দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে, যার মাধ্যমে নিরাপদ জ্বালানি পরিবহন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।