ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম এখন কত? ট্রাম্পের টুইট ও ইরানের অস্বীকারে টালমাটাল আন্তর্জাতিক বাজার

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা এবং সরবরাহ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দামে আবারও বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসের শুরুতেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও সমঝোতা নিয়ে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের পক্ষ থেকে আসা পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।


সংকট নিরসনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের ‘গঠনমূলক’ আলোচনা হয়েছে। ট্রাম্প তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে জানান, দুই দেশ একটি ‘পূর্ণাঙ্গ’ ও ‘চূড়ান্ত’ সমাধানের খুব কাছাকাছি রয়েছে। তবে তেহরানের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনো ধরনের আলোচনা হয়নি। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ-বাঘের গালিবাফ ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে ‘ভুয়া তথ্য’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, বাজারকে প্রভাবিত করতেই এমন প্রচারণা চালানো হচ্ছে।


এই দুই শক্তির পাল্টাপাল্টি অবস্থানের সরাসরি প্রভাব পড়েছে তেলের বাজারে। সোমবার একপর্যায়ে ‘ব্রেন্ট ক্রুড’ (Brent Crude) তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৩ ডলারে উঠে গিয়েছিল। তবে ট্রাম্পের সমঝোতার বার্তার পর দাম দ্রুত কমে ৯৬ ডলারে নেমে আসে। কিন্তু ইরানের পক্ষ থেকে আলোচনার খবর অস্বীকার করার পর আজ মঙ্গলবার সকালে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তেলের দাম আবারও বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ গতকালের সর্বোচ্চ দামের তুলনায় বর্তমানে তেলের দাম ১০ ডলার কম থাকলেও বাজারের অস্থিরতা কাটেনি।


এদিকে ট্রাম্পের আশাবাদী বক্তব্যের প্রভাবে সোমবার ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে (Share Market) ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। লন্ডনের এফটিএসই ১০০ (FTSE 100) সূচক দিনের শুরুতে ২ শতাংশ পড়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত সামলে ওঠে। জার্মানির ড্যাক্স (DAX) সূচক ১.২ শতাংশ এবং ফ্রান্সের সিএসি (CAC) সূচক প্রায় ০.৯ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এবং ডাও জোন্স সূচকে ১ শতাংশের বেশি উত্থান দেখা গেছে। তবে এশিয়ার বাজারগুলো এই সুফল পায়নি। জাপানের নিক্কেই ৩.৫ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি ৬.৫ শতাংশ পতনের মধ্য দিয়ে গতকালের লেনদেন শেষ করেছে।


জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে সংঘাত শুরুর পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত বন্ধ রয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই পথ বন্ধ থাকায় জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো চরম জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে।


আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (IEA) প্রধান ফাতিহ বিরোল সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে বিশ্ব গত কয়েক দশকের মধ্যে ভয়াবহতম জ্বালানি সংকটে পড়তে পারে। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট এবং ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধের পরিণতির সঙ্গে তুলনা করেছেন। একই সুরে বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুসানাহ স্ট্রিটার বলেছেন, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের উপরে থাকায় সাধারণ ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব অনিবার্য।


উল্লেখ্য, এর আগে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি না খুললে ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংস করা হবে। জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পাল্টা হামলার হুমকি দিয়ে রেখেছে। বর্তমানে পাঁচ দিনের জন্য হামলা স্থগিত রাখার কথা ট্রাম্প বললেও, আলোচনার কোনো অস্তিত্ব ইরান স্বীকার না করায় বিশ্বজুড়ে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলে হরমুজ প্রণালি দ্রুত চালুর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন, কারণ দেশটিতে ইতিমধ্যে জ্বালানির দাম ও সরকারি ঋণের সুদহার নিয়ে অস্থিরতা শুরু হয়েছে।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।