"পুঁজিবাজারকে জুয়ার বাজার নয়, শিল্পায়নের ইঞ্জিন হিসেবে দেখতে হবে": এনবিআর চেয়ারম্যানের মন্তব্য

দেশের পুঁজিবাজারকে সর্বজনের মালিকানায় আনার এবং একটি আন্তর্জাতিক মানের ইসলামিক স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে নতুন সরকার আগামী বাজেটে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি মনে করেন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে এসে যেন স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশে লেনদেন করতে পারেন, সেই সুযোগ তৈরি করা উচিত। আজ রোববার রাজধানীর পল্টনের একটি হোটেলে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) আয়োজিত ‘শেয়ারবাজারে নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ এবং করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।


রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর তার বক্তব্যে বাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে সঠিকভাবে কাজ করার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, "তাদের কাজে যদি কোনো ব্যত্যয় ঘটে, তাহলে শাস্তির ব্যবস্থা থাকা দরকার। পুঁজিবাজার যেন সাধারণ মানুষের বাজারে পরিণত হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ আমরা আগামী বাজেটে হাজির করব।" এই ঘোষণা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।


প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা প্রবাসীদের বিনিয়োগের সুযোগ নিয়েও সরকারের চিন্তাভাবনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "প্রবাসীদের ক্ষেত্রেও আমরা ইনভেস্টমেন্ট গেটওয়ের চিন্তাভাবনা করছি যে কীভাবে প্রবাসীরাও এই ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করতে পারেন।" পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।


সেমিনারে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান, বিএসইসি কমিশনার মো. সাইফুদ্দিন, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) সভাপতি রিয়াদ মাহমুদ, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) চেয়ারম্যান এ কে এম হাবিবুর রহমান, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাধারণ সম্পাদক সুমিত পোদ্দার। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. মনিরুজ্জামান।


শেয়ারবাজারে আস্থা সংকট ও অতীত কারসাজি


রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর তার বক্তব্যে শেয়ারবাজারের প্রতি জনগণের মধ্যে বিদ্যমান আস্থার অভাবকে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, "আমরা অতীতে লক্ষ করেছি অন্য সরকারের আমলে বারবার শেয়ারবাজারে কারসাজি হয়েছে। ফলে জনগণ পুঁজিবাজারে কোনো আস্থা পায়নি।" তিনি জোর দিয়ে বলেন, "শেয়ারের দরের ওঠানামার প্রকল্প নিয়ে শেয়ারবাজারকে বেঁধে ফেলা যাবে না। শেয়ারবাজারকে নিয়ে যেতে হবে সর্বজনের মালিকানা এবং সর্বজনের অংশগ্রহণের গভীরতর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে। সেখানে আমরা সবাই অংশগ্রহণ করব; একে অপরের সঙ্গে বিনিময় করব। যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।" এটি একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল পুঁজিবাজার গঠনের জন্য অপরিহার্য।


শুধু প্রণোদনায় টেকসই হয় না পুঁজিবাজার: এনবিআর চেয়ারম্যান


এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান তার বক্তব্যে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া এবং প্রণোদনার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, "পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার দায়িত্ব যাদের ওপর—যেমন মার্চেন্ট ব্যাংক, ইস্যু ম্যানেজার, অডিটর এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো—তাদের দায়িত্ব হচ্ছে এমন কোম্পানিকেই তালিকাভুক্ত করা, যাদের দীর্ঘমেয়াদি লাভ করার সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে।"


তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, "দুঃখজনকভাবে আমরা গত ১০–২০ বছরে এমন অনেক কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত হতে দেখেছি, যাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছে, কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে অথবা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।"


আবদুর রহমান খান বলেন, "আমরা অতীতেও অনেক ধরনের প্রণোদনা দিয়েছি। এমনকি যখন বাজারে ধস নেমেছে, তখনো বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধু প্রণোদনা দিয়েই বাজারকে টেকসই করা যায় না।" উদাহরণ হিসেবে তিনি সম্প্রতি ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার কথা উল্লেখ করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল বাজারে স্বস্তি আনা। তিনি বলেন, "প্রথম দিকে বাজারে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেলেও পরে আবার বাজার নিম্নমুখী হয়েছে। অর্থাৎ শুধু করছাড় বা প্রণোদনা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া যায় না।"


এনবিআর চেয়ারম্যান আরও বলেন, অনেক নীতিনির্ধারক এখনো পুঁজিবাজারকে ‘জুয়ার বাজার’ হিসেবে দেখেন। এই ভ্রান্ত ধারণা ভাঙতে হবে। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, "বাস্তবে পৃথিবীর কোনো দেশই শক্তিশালী পুঁজিবাজার ছাড়া শিল্পায়নে সফল হয়নি।" মিউচুয়াল ফান্ড নিয়েও একটি বড় সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন, যা ছোট বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরাপদ বিনিয়োগের সুযোগ করে দিতে পারে।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।