ঋণ শোধের চাপ থেকে চিরতরে মুক্তি পাচ্ছেন ১৩ লাখ কৃষক! তবে অর্থ ছাড়ের আগে কেন 'অডিট' বা নিরীক্ষার কড়াকড়ি?

দেশের প্রান্তিক কৃষকদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা হতাশা ও অর্থনৈতিক চাপ লাঘব করতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ সম্পূর্ণ মওকুফ করার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাড়ের আগে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি হিসাব নিবিড়ভাবে ‘অডিট’ বা নিরীক্ষা করা হবে। অডিট শেষে তবেই কৃষকেরা এই মেগা সুবিধার আওতায় আসবেন।


সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশের মোট ১৩ লাখ ১৭ হাজার ৪৯৮ জন কৃষক এই ঋণ মওকুফ-সুবিধার আওতাভুক্ত হবেন। আর কৃষকের কাঁধ থেকে এই ঋণের বোঝা নামাতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সরকারের সর্বমোট ব্যয় হবে ১ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা।


সংশ্লিষ্ট অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই কর্মসূচির অর্থায়নের জন্য আগামী সপ্তাহেই অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে পুরো টাকা হস্তান্তর করবে। পরবর্তীতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে ধাপে ধাপে টাকাগুলো পৌঁছাবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর হাতে। তবে তার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে একটি কঠোর অডিট বা নিরীক্ষা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে, যাতে কোনো ধরনের আর্থিক অনিয়ম না ঘটে।


এর আগে, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার এক বিশেষ বৈঠকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মূলত সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে এটি ছিল বর্তমান ক্ষমতসীন দল বিএনপির অন্যতম প্রধান একটি প্রতিশ্রুতি। শস্য, ফসল উৎপাদনকারী কৃষকের পাশাপাশি মৎস্য চাষি ও পশুপালন খাতের সঙ্গে যুক্ত প্রান্তিক খামারিরাও এই সুবিধার আওতাভুক্ত হবেন। ওই দিন মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, সরকারের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফলে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১২ লাখ কৃষকের মোট ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকার ঋণ মওকুফ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


তবে মন্ত্রিসভার ওই নীতিগত সিদ্ধান্তের পর, গত ২ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ এ নিয়ে একটি বিশদ পর্যালোচনা বৈঠক করে। সেই হাই-প্রোফাইল বৈঠকের পর চূড়ান্ত হিসাবে দেখা যায়, সুবিধাভোগীর সংখ্যা ১২ লাখ নয়, বরং ঋণ মওকুফ-সুবিধা পাবেন মোট ১৩ লাখ ১৭ হাজার ৪৯৮ জন কৃষক। এর ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ব্যয়ের পরিমাণও কিছুটা বেড়ে ১ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়।


অর্থ বিভাগের নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের এই অর্থ দেশের মোট ১৫টি ব্যাংক গ্রহণ করবে। এর মধ্যে রাষ্ট্রমালিকানাধীন কমার্শিয়াল (বাণিজ্যিক) ও স্পেশালাইজড (বিশেষায়িত) ব্যাংক রয়েছে আটটি। এগুলো হলো—কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব), সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক এবং আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক। অন্যদিকে, এই তালিকায় থাকা সাতটি বেসরকারি ব্যাংক হলো-ইসলামী ব্যাংক, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, উত্তরা ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক।


হিসাব অনুযায়ী, রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ওই ৮টি ব্যাংক তাদের ১৩ লাখ ১৭ হাজার ৪৭ জন কৃষকের কৃষিঋণের বিপরীতে সরকারের কাছ থেকে পাবে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। আর বেসরকারি খাতের ৭টি ব্যাংক মাত্র ৪৫১ জন কৃষকের ঋণের বিপরীতে পাবে ৩৯ লাখ টাকা।


সরকারের এই উদ্যোগের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রথিতযশা অধ্যাপক ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান দৈনিক প্রথম আলোকে বলেন, "ঋণ মওকুফের এ সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে প্রান্তিক কৃষকের ওপর চরম আর্থিক চাপ কমাবে।" তবে তিনি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ বাতলে দিয়ে আরও বলেন, "শুধুমাত্র ঋণ মওকুফের পাশাপাশি কৃষকদের জন্য দরকার টেকসই কৃষি সহায়তা, ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, আধুনিক ফসল বিমা ও সহজ শর্তে পুনঃ অর্থায়নের মতো কাঠামোগত সংস্কার চালু করা। এগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে দীর্ঘ মেয়াদে দেশের কৃষি খাত এক শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।"


সবচেয়ে বেশি টাকা পাচ্ছে শীর্ষ তিন ব্যাংক অর্থ বিভাগের বিশদ ডেটা অনুযায়ী, ঋণ মওকুফ সুবিধার আওতায় থাকা ১৫টি ব্যাংকের দেওয়া সর্বমোট কৃষিঋণের আসলের পরিমাণ ৯১৭ কোটি টাকা এবং এর বিপরীতে জমে থাকা সুদ হলো ৭৮২ কোটি টাকা। এছাড়া ব্যাংকগুলোর 'ইন্টারেস্ট সাসপেন্স' বা অনিশ্চিত হিসাবে আরও ১৩৮ কোটি টাকা আটকে আছে। তবে মওকুফ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে এই অনিশ্চিত হিসাবের টাকাকে সম্পূর্ণ বাদ রাখা হয়েছে। কারণ, কোনো ঋণ খেলাপি হওয়ার পর তার বিপরীতে অর্জিত সুদ অনিশ্চিত হিসাবে জমা রাখা হয়, যা ব্যাংকিং নিয়মে প্রকৃত আয় হিসেবে গণ্য হয় না।


আসল ও সুদের পাশাপাশি স্বস্তির খবর হলো, কৃষকদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ে বিভিন্ন ব্যাংকের করা মামলার বিপরীতে আইনি খরচও মওকুফের আওতায় রাখা হয়েছে। জানা গেছে, কৃষি ব্যাংক, রাকাব, সোনালী, অগ্রণী ও জনতাসহ সাতটি ব্যাংকের করা মামলার বিপরীতে আইনি খরচ বা কোর্ট ফি বাবদ সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে ৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা প্রদান করবে।


গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হালনাগাদ করা হিসাব বলছে, মওকুফ সুবিধার আওতায় থাকা ৬ লাখ ৮৯ হাজার ৬২৮ জন কৃষকের বিপরীতে সুদসহ ঋণের টাকা বাবদ সর্বোচ্চ ৮২০ কোটি ২২ লাখ টাকা একাই পাবে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। সুবিধার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সোনালী ব্যাংক; তারা ৩ লাখ ৪ হাজার ৪৪৭ জন কৃষকের বিপরীতে পাবে ৩৫০ কোটি ১২ লাখ টাকা। আর রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) ১ লাখ ৬৯ হাজার ৫৬৪ জন কৃষক এই সুবিধা পাবেন, যার জন্য ব্যাংকটি সরকারের কাছ থেকে পাবে ১৮৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।


বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি টাকা পাবে ইসলামী ব্যাংক। ২২৮ জন কৃষকের ঋণ মওকুফের বিপরীতে তারা পাবে ২০ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। পরের অবস্থানে থাকা আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ১৯৩ জন কৃষকের ঋণের বিপরীতে পাবে ১৩ লাখ ৫২ হাজার টাকা।


যে প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়িত হবে ঋণ মওকুফ অর্থ বিভাগের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক এখন ঋণ মওকুফের জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড 'ফরম্যাট' বা ছক তৈরি করে দেবে। সেই ছকের ভিত্তিতে প্রতিটি ব্যাংক তাদের স্ব স্ব ডেটা অর্থ বিভাগে প্রেরণ করবে। তবে এর আগে, ব্যাংকগুলোকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনারোপিত সুদ হিসাব করে নিজ নিজ পরিচালনা পর্ষদের (বোর্ড) সভায় এই ঋণ মওকুফ সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নিতে হবে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব অ্যাকাউন্টে ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন করে আর এক পয়সাও সুদ আরোপ করা যাবে না এবং ব্যাংকগুলোর নিজস্ব খতিয়ান (লেজার) থেকে এই ঋণের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করতে হবে। যদি ঋণ-সংশ্লিষ্ট কোনো মামলা চলমান থাকে, তবে স্ট্যাম্প মাশুলসহ আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ সরকার বহন করবে, তবে কোনোভাবেই আইনজীবীর ফি বা খরচ সরকার দেবে না।


পাশাপাশি অর্থ বিভাগ সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, 'ইন্টারেস্ট সাসপেন্স' বা অনিশ্চিত হিসাবে থাকা সুদ ও আসলের দায় গ্রহণের কোনো আইনি সুযোগ সরকারের নেই। এই নির্দিষ্ট বিষয়টি সরকার ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধান করা হবে।


সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যাংকগুলো ঋণ মওকুফের যে তথ্য ও হিসাব দাখিল করবে, তা সেন্ট্রাল ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক পুনরায় কড়াকড়িভাবে নিরীক্ষা (অডিট) করবে। এরপর সেই নিরীক্ষিত ও যাচাইকৃত চূড়ান্ত হিসাব পর্যায়ক্রমে সরকারের কাছে পাঠানো হবে। সরকার তখন নিরীক্ষিত অংশের দায় পরিশোধ করে ব্যাংকগুলোকে টাকা বুঝিয়ে দেবে। দায় পরিশোধ হওয়ার পর ব্যাংকগুলো কৃষকদের বিরুদ্ধে করা সব মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নেবে এবং প্রতি মাসে মামলা প্রত্যাহারের আপডেট তথ্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে লিখিতভাবে অবহিত করবে।


কৃষকদের ওপর বিগত দিনের ঋণ ও মামলার খড়গের উদাহরণ টানতে গিয়ে ইসলামী ব্যাংকের একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বালুগ্রামের প্রান্তিক কৃষক আফজাল হোসেনের একটি মর্মান্তিক ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, কৃষক আফজাল ব্যাংকের রহনপুর শাখা থেকে সামান্য অঙ্কের ঋণ নিয়েছিলেন। ২০২২ সালে ব্যাংক শুধু তার কাছ থেকে ঋণের টাকাই নয়, বরং উল্টো মামলার খরচও জোরপূর্বক আদায় করেছিল। এতকিছুর পরও ওই অসহায় কৃষককে কারাগারে যেতে হয়েছিল। একই বছর (২০২২) পাবনার ঈশ্বরদীতে সমবায় ব্যাংক থেকে মাত্র ৩০ হাজার টাকা করে ঋণ নিয়ে অভাবের তাড়নায় তা পরিশোধ না করতে পারায় ৩৭ জন কৃষকের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল, যা দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। এ ধরনের অমানবিক ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে দেশে আর কখনো না ঘটে, সেজন্য বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোকে অত্যন্ত কঠোরভাবে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।