ঈদ সালামিতেও মুদ্রাস্ফীতির ধাক্কা? ১০০০ টাকার নতুন নোটের বান্ডিলে গুনতে হচ্ছে বাড়তি ৭০০ টাকা!

পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয় নতুন টাকার কচকচে নোট। ছোটদের ঈদ সালামি দেওয়া থেকে শুরু করে অভাবীদের জাকাত ও ফিতরা বিতরণে নতুন নোটের চাহিদা প্রতিবছরই তুঙ্গে থাকে। তবে এবারের চিত্রটা সাধারণ মানুষের জন্য বেশ অস্বস্তিকর। ঈদ আসতে এখনো বেশ কিছুটা সময় বাকি থাকলেও রাজধানীর নতুন নোটের বাজারগুলোতে এরই মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র অস্থিরতা। সরবরাহ সংকটের অজুহাতে বিক্রেতারা প্রতিটি বান্ডিলে অস্বাভাবিক বাড়তি দাম আদায় করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।


সরেজমিনে রাজধানীর মতিঝিলের সেনা কল্যাণ ভবনের সামনে এবং গুলিস্তানের অস্থায়ী টাকার হাটগুলো ঘুরে দেখা গেছে, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নতুন নোটের ব্যবসা জমে উঠলেও ক্রেতাদের পকেট কাটছেন বিক্রেতারা। বিশেষ করে ১০ টাকার নোটের বান্ডিল (১০০টি নোট) সংগ্রহ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এক হাজার টাকা মূল্যমানের ১০ টাকার এক বান্ডিল নোটের জন্য ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ১ হাজার ৫৫০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ ১০০০ টাকার নোট পেতে বাড়তি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত ‘প্রিমিয়াম’ বা বকশিশ দিতে হচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। গত বছর এই বাড়তি দাম ছিল ৩০০ টাকার আশেপাশে। মূলত ‘জুলাই গ্রাফিতি’ সম্বলিত নোটের প্রতি বাড়তি আকর্ষণ এবং বাজারে নতুন নোটের তীব্র স্বল্পতাকে এই চড়া দামের কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা।


এবারের এই সংকটের নেপথ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি বড় সিদ্ধান্ত কাজ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, নোট ছাপানোর বিশেষ কাগজ এবং কালির সংকটের কারণে নতুন নোট ছাপানোর গতি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে এবার ব্যাংকগুলো থেকে ঢালাওভাবে নতুন টাকা সরবরাহ করা হবে কি না, তা নিয়ে ঘোর সংশয় দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সরাসরি খোলা বাজারে। অনেক আগেভাগেই সাধারণ মানুষ ভিড় করছেন অস্থায়ী দোকানগুলোতে।


বাজারের এই অস্থিরতা নিয়ে ভুক্তভোগী ক্রেতা এবং প্রবাস ফেরত যুবক আকিব জানান, প্রতিবছরই তিনি সালামির জন্য নতুন টাকা সংগ্রহ করেন। সাধারণত ঈদের আগমুহূর্তে দাম কিছুটা বেশি থাকে, কিন্তু এবার রমজানের শুরু থেকেই বিক্রেতারা আকাশচুম্বী দাম চাইছেন। সোহেল নামে এক উবার চালক বলেন, "শুনেছি এবার বাংলাদেশ ব্যাংকের কাউন্টার থেকে নতুন নোট পাওয়া যাবে না, তাই বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে বাজার থেকে সংগ্রহ করছি।" অন্যদিকে বিক্রেতা সাব্বির ও মাহমুদ দাবি করছেন, তারা নিজেরাও সরাসরি ব্যাংক থেকে নোট পাচ্ছেন না। বিভিন্ন হাত ঘুরে এবং ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে চড়া দামে এসব সংগ্রহ করতে হচ্ছে বিধায় তারাও বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।


দরের তালিকায় দেখা যায়, ২০ টাকার বান্ডিলে ৫০০ টাকা, ২ টাকার বান্ডিলে ৩০০ টাকা এবং ৫০, ১০০ ও ৫০০ টাকার বান্ডিলে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি রাখা হচ্ছে। অথচ কয়েক বছর আগেও ২, ৫ বা ১০ টাকার নোটে বাড়তি খরচ হতো মাত্র ৮০ থেকে ১০০ টাকা। এবারের ঈদে ১০, ২০ ও ৫০ টাকার নোটের চাহিদা সবথেকে বেশি হলেও ৫ টাকার নোটের চাহিদা কিছুটা কম বলে জানান বিক্রেতারা।


এই সামগ্রিক পরিস্থিতির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, "কাগজ সরবরাহের সমস্যার কারণে নোট ছাপানোর গতি কিছুটা সীমিত। তবে বর্তমান সরকারের একটি বড় লক্ষ্য হলো ধীরে ধীরে ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ গড়ে তোলা। নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত আকারে নতুন নোট ইস্যু করা হচ্ছে।"


উল্লেখ্য, স্বাধীন বাংলাদেশে মুদ্রার ইতিহাস শুরু হয় ১৯৭২ সালের ৪ মার্চ ১, ৫, ১০ ও ১০০ টাকার নোটের মাধ্যমে। বর্তমানে দেশে ব্যাংক নোট (গভর্নরের সই যুক্ত) এবং সরকারি নোট (অর্থ সচিবের সই যুক্ত) এই দুই ধরনের মুদ্রা প্রচলিত রয়েছে। ৫ টাকাকে ২০১৫ সালে সরকারি মুদ্রায় রূপান্তর করা হয়। সর্বশেষ ২০০৮ সালে ১০০০ টাকার নোট এবং ২০২০ সালে ২০০ টাকার নোট বাজারে নিয়ে আসে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ছাপানোর বর্তমান ‘লিমিট’ বা সীমাবদ্ধতা ঈদ সালামির ঐতিহ্যে কিছুটা হলেও ভাটা ফেলছে বলে মনে করছেন সাধারণ নাগরিকরা।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।