স্তনে গুটি মানেই কি ক্যানসার? ৫টি মারাত্মক ভুল ধারণা নিয়ে চিকিৎসকদের বড় সতর্কতা!

বিশ্বজুড়ে নারী ও পুরুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অন্যতম বড় উদ্বেগের নাম স্তন ক্যানসার। তবে এই স্পর্শকাতর ও প্রাণঘাতী রোগটি নিয়ে জনমনে সচেতনতার চেয়ে অমূলক ভয় ও নানা ভিত্তিহীন কুসংস্কারই বেশি দেখা যায়। সঠিক বৈজ্ঞানিক তথ্যের অভাবে অনেক সময় যেমন সামান্য কারণে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয়, তেমনি অবহেলার কারণে মারাত্মক ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্তন ক্যানসার নিয়ে সমাজে প্রচলিত অন্তত পাঁচটি সাধারণ ভুল ধারণা রয়েছে, যা প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ ও সঠিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

প্রথম ভুল ধারণা: স্তনে গুটি মানেই ক্যানসার
অনেকেই স্তনে নতুন কোনো শক্ত মাংসপিণ্ড বা ছোট গুটি অনুভব করলেই তাৎক্ষণিকভাবে ক্যানসারের আশঙ্কায় ভেঙে পড়েন। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, স্তনে গুটি হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি শারীরবৃত্তীয় ঘটনা এবং এর সিংহভাগই ক্ষতিকর নয়। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ২০ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত এমন কিছু সাধারণ শারীরিক পরিবর্তনের মুখোমুখি হন, যার কারণে স্তনে নির্দোষ গুটি বা লাম্প তৈরি হতে পারে। এগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষতিকর কোনো টিউমার বা ক্যানসার নয়। বিশেষ করে নারীদের শরীরে হরমোনের মাত্রার নিয়মিত ওঠানামার কারণে এমনটা ঘটে থাকে, যার অনেক ক্ষেত্রে কোনো ধরনের চিকিৎসারই প্রয়োজন পড়ে না। তবে লক্ষণটি নিশ্চিত হতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে পরীক্ষা করানো জরুরি।

দ্বিতীয় ভুল ধারণা: স্তন ক্যানসার মূলত বয়স্ক নারীদের রোগ
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে—এটি প্রমাণিত সত্য। সাধারণত ৪০ বছরের বেশি বয়সী নারীদের মধ্যেই এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। তবে এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল যে তরুণীরা এর ঝুঁকিমুক্ত। গবেষণার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মোট স্তন ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ৫ শতাংশই ৪০ বছরের কম বয়সী নারী। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রখ্যাত চিকিৎসক হ্যালি মুর স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, "প্রাপ্তবয়স্ক যেকোনো বয়সেই স্তন ক্যানসার হতে পারে। বিশেষ করে পরিবারে এই রোগের ইতিহাস থাকলে বা অন্য কোনো ঝুঁকি থাকলে আশঙ্কা আরও বাড়তে পারে।"

তৃতীয় ভুল ধারণা: শুধু নারীরাই এতে আক্রান্ত হন
স্তন ক্যানসার মূলত নারীদের রোগ হিসেবে পরিচিত হলেও এটি কেবল তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; পুরুষদেরও স্তন ক্যানসার হতে পারে। এমনকি পূর্ববর্তী কোনো দৃশ্যমান ঝুঁকি না থাকা সত্ত্বেও একজন পুরুষ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মোট স্তন ক্যানসার আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ১ শতাংশেরও কম। তবে সমাজের প্রচলিত ট্যাবু বা ভ্রান্ত ধারণার কারণে পুরুষরা প্রাথমিক লক্ষণগুলোকে চরমভাবে উপেক্ষা করেন, যার ফলে রোগটি যখন শনাক্ত হয় ততক্ষণে চিকিৎসার মূল্যবান সময় পেরিয়ে যায়। নারীদের মতো যেকোনো বয়সেই পুরুষরা আক্রান্ত হতে পারলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সী পুরুষদের মধ্যে স্তন ক্যানসার ধরা পড়ে।

চতুর্থ ভুল ধারণা: পরিবারে ইতিহাস না থাকলে ঝুঁকি নেই
রক্তের সম্পর্কের এক বা একাধিক নিকটাত্মীয়ের স্তন ক্যানসার হয়ে থাকলে ব্যক্তির ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়—এটি জিনতাত্ত্বিকভাবে সত্য। মানবদেহে এমন এক ডজনের বেশি নির্দিষ্ট জিন চিহ্নিত হয়েছে, যেগুলো সক্রিয় থাকলে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধি পায়। তবে পরিবারে কারও এই রোগের ইতিহাস নেই বলেই যে কেউ শতভাগ ঝুঁকিমুক্ত থাকবেন, এমনটি ভাবা চরম ভুল। বংশগত ইতিহাস ছাড়াও জীবনযাপন পদ্ধতি, পরিবেশ কিংবা দৈব পরিবর্তনের কারণে যে কারও শরীরে যেকোনো সময় স্তন ক্যানসার বাসা বাঁধতে পারে।

পঞ্চম ভুল ধারণা: স্তন ক্যানসার সবসময় গুটি দিয়েই শুরু হয়
স্তনে শক্ত গুটি দেখা দেওয়া স্তন ক্যানসারের অন্যতম চেনা উপসর্গ হলেও এটিই একমাত্র বা বাধ্যতামূলক লক্ষণ নয়। অনেক সময় কোনো প্রকার বাহ্যিক গুটি ছাড়াই রোগটি নীরব ঘাতক হিসেবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ডা. হ্যালি মুর সতর্ক করে বলেন, "লক্ষণ হিসেবে কখনো কখনো স্তনে ব্যথা বা ফোলা ভাব দেখা দিতে পারে। বগলের নিচের লসিকাগ্রন্থিও ফুলে যেতে পারে। আবার অনেক সময় স্তন ক্যানসারের কোনো লক্ষণই দেখা যায় না।"

লক্ষণহীন এমন জটিল পরিস্থিতির কারণেই চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা নিয়মিত স্ক্রিনিং ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, নারীদের বয়স ৪০ বছর পূর্ণ হলেই ঝুঁকি এড়াতে প্রতি বছর নিয়মমাফিক ম্যামোগ্রাম পরীক্ষা করানো উচিত, যাতে কোনো অস্বাভাবিকতা তৈরি হলে তা শুরুতেই শনাক্ত করে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।