ছেলে নেই, তাই জামাইকেই উত্তরসূরি বানায় জাপানের পরিবার

বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে শুধু জামাই নয়, পরিবারেরই একজন হয়ে ওঠা জাপানে এমন ঘটনা একেবারে অচেনা নয়। বরং দেশটির দীর্ঘদিনের সামাজিক ও আইনি প্রথা রয়েছে, যেখানে মেয়ের স্বামীকেই দত্তক নিয়ে পরিবারের ছেলে ও ভবিষ্যৎ উত্তরসূরি করা হয়। এই প্রথার নাম ‘মুকোয়োশি’। সহজ বাংলায় একে বলা যায় ‘দত্তক ঘরজামাই’।

বিশ্বের অনেক দেশে দত্তক নেওয়ার সঙ্গে সাধারণত শিশুকে নতুন পরিবারে বড় করে তোলার ধারণাই বেশি পরিচিত। কিন্তু জাপানে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকেও দত্তক নেওয়ার ঐতিহ্য রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির মোট দত্তকের বড় অংশই প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে ঘিরে।

সাধারণত তরুণ বয়সী পুরুষদের এভাবে পরিবারে নেওয়া হয়। তবে এর পেছনে শুধু পারিবারিক আবেগ নয়, অনেক সময় থাকে ব্যবসা, সম্পদ ও উত্তরাধিকার ধরে রাখার পরিকল্পনাও।

ছেলে নেই, তাই জামাইই উত্তরসূরি

জাপানের বহু পুরোনো ব্যবসা এখনো পারিবারিক মালিকানায় পরিচালিত হয়। কোনো পরিবারে ছেলে না থাকলে কিংবা পরিবারের নিজের সন্তানকে ব্যবসার উত্তরসূরি হিসেবে উপযুক্ত মনে না হলে তারা একজন যোগ্য পুরুষকে দত্তক নিতে পারে।

সেই ব্যক্তি যদি পরিবারের মেয়ের স্বামী হন, তাহলে প্রক্রিয়াটি আরও স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর তাকে দত্তক নেওয়া হলে তিনি শ্বশুরবাড়ির পদবি গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে পরিবারের ব্যবসা, সম্পদ ও উত্তরাধিকারও তার হাতে যেতে পারে।

অর্থাৎ, সম্পর্কটি শুধু ‘জামাই’ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না। তিনি হয়ে ওঠেন পরিবারের ছেলে এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসার পরবর্তী কর্তা।

‘মুকোয়োশি’ প্রথার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো পারিবারিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। পরিবারের পদবি যেন হারিয়ে না যায়, ব্যবসার নেতৃত্ব যেন পরিবারের বাইরে চলে না যায় এবং বহু বছরের প্রতিষ্ঠান যেন পরবর্তী প্রজন্মেও টিকে থাকে এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এই ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়েছে।

ঐতিহ্যগতভাবে জাপানে বিয়ের পর স্ত্রী স্বামীর পদবি গ্রহণ করেন। ফলে কোনো পরিবারে ছেলে না থাকলে পারিবারিক পদবি ধরে রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মেয়ের স্বামীকে দত্তক নিয়ে তাকে পরিবারের পদবি দেওয়ার মাধ্যমে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হয়।

এভাবেই একজন জামাই একই সঙ্গে হয়ে উঠতে পারেন পরিবারের ছেলে, ব্যবসার উত্তরসূরি এবং পরিবারের নাম বহনকারী।

জাপানের ব্যবসায়িক ইতিহাসেও ‘মুকোয়োশি’র উদাহরণ রয়েছে। সুজুকি মোটর করপোরেশনের নেতৃত্বে একাধিকবার দত্তক পুত্রের আগমন ঘটেছে। প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের প্রধান ওসামু সুজুকিও ছিলেন এই প্রথায় পরিবারে আসা একজন দত্তক ঘরজামাই।

নিনটেনডো, কিক্কোমান ও টয়োটার মতো জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের উত্তরাধিকার ব্যবস্থার সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।

ফলে দেশটির কিছু দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক ব্যবসার ধারাবাহিকতার পেছনে ‘মুকোয়োশি’ প্রথার ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।

তবে এই প্রথা শুধু ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উত্তরাধিকার পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও প্রাপ্তবয়স্ক কাউকে দত্তক নেওয়ার ঘটনা রয়েছে। বিশেষ করে নিঃসন্তান দম্পতিরা ভবিষ্যতে তাদের সম্পদ ও পারিবারিক দায়িত্ব কার হাতে থাকবে, তা নিশ্চিত করতে এ পথ বেছে নিতে পারেন।

দত্তক প্রক্রিয়াটি জাপানের সরকারি পারিবারিক নথি ‘কোসেকি’-তে নিবন্ধিত হয়। দত্তক সম্পন্ন হওয়ার পর ওই ব্যক্তি নতুন পরিবারের পদবি গ্রহণ করতে পারেন এবং জন্মসন্তানের মতোই পারিবারিক অধিকার, উত্তরাধিকার ও দায়িত্ব পান।

এর সঙ্গে দায়িত্বও আসে। পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের দেখাশোনা এবং পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়টিও দত্তক নেওয়া সন্তানের ওপর বর্তাতে পারে।

বিদেশিরাও কি হতে পারেন ‘মুকোয়োশি’?

প্রশ্ন উঠতে পারে, এই ব্যবস্থায় বিদেশিদেরও জায়গা আছে কি না।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাপানে বসবাসরত বিদেশিরাও নির্দিষ্ট আইনি শর্ত পূরণ করলে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দত্তক হতে পারেন। কিছু পরিস্থিতিতে আদালতের অনুমোদনের প্রয়োজন হতে পারে।

অর্থাৎ, কোনো বাংলাদেশি ব্যক্তি প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করলে জাপানি পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক দত্তক সন্তান হওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। তবে দত্তক নেওয়া হলেই জাপানের নাগরিকত্ব বা ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যায় না। সেগুলোর জন্য আলাদা অভিবাসন ও নাগরিকত্বসংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে।

জন্মহার কমছে, বাড়ছে উত্তরাধিকারীর গুরুত্ব

আধুনিক জাপানে জন্মহার কমে যাওয়ার সঙ্গে পারিবারিক ব্যবসার উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে। কোনো পরিবারের সন্তান থাকলেও ছেলে নাও থাকতে পারেন। আবার নিজের সন্তান ব্যবসা পরিচালনায় আগ্রহী বা উপযুক্ত না-ও হতে পারেন।

তখন সামনে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দীর্ঘদিনের ব্যবসা বা পারিবারিক প্রতিষ্ঠান কে পরিচালনা করবেন?

এমন পরিস্থিতিতে কোনো কোনো পরিবার পুত্রসন্তানের অপেক্ষা না করে একজন উপযুক্ত পুরুষকে উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নেয়। মেয়ের স্বামী হলে তিনি একই সঙ্গে পরিবারের সদস্য ও সম্ভাব্য ব্যবসায়িক উত্তরসূরি হয়ে উঠতে পারেন।

উপযুক্ত উত্তরসূরি খুঁজে নেওয়ার বিষয়টি এতটাই পরিচিত যে জাপানে এ ধরনের সম্পর্ক তৈরিতে সহায়তাকারী বিশেষ ম্যাচমেকিং সেবার অস্তিত্বের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।

এ নিয়ে জাপানে একটি প্রচলিত ধারণাও রয়েছে ছেলে বেছে নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও জামাই বেছে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে সময়ের সঙ্গে ‘মুকোয়োশি’ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। আধুনিক জাপানে নারীরা ব্যবসা, প্রশাসন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে ক্রমেই বেশি ভূমিকা রাখছেন। ফলে শুধু পুরুষ উত্তরাধিকারী খোঁজার ঐতিহ্যগত ধারণা কতটা প্রয়োজনীয়, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

তারপরও প্রথাটি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

কারও কাছে এটি একজন জামাইকে পরিবারের ছেলে করে নেওয়ার গল্প। কারও কাছে শত বছরের ব্যবসা টিকিয়ে রাখার কৌশল। আবার কারও কাছে এটি পারিবারিক পদবি, সম্পদ ও উত্তরাধিকার পরবর্তী প্রজন্মের হাতে পৌঁছে দেওয়ার একটি ঐতিহাসিক ব্যবস্থা।

জাপানের ‘মুকোয়োশি’ তাই শুধু দত্তক নেওয়ার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিয়ে, পরিবার, ব্যবসা, উত্তরাধিকার এবং বদলে যাওয়া সমাজের এক অনন্য সহাবস্থান।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।