ক্লান্তি থেকে কালসিটে দাগ, শিশুর শরীরে কীসের সংকেত?

যুক্তরাজ্যে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের রোগজনিত মৃত্যুর প্রধান কারণ ক্যানসার। বিষয়টি উদ্বেগজনক হলেও আরও চিন্তার কারণ হলো, এ রোগের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে অনেক অভিভাবকেরই পর্যাপ্ত ধারণা নেই। প্রতি বছর দেশটিতে প্রায় ১ হাজার ৯০০ শিশু ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। সম্প্রতি এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, মাত্র এক-তৃতীয়াংশ অভিভাবক শিশুদের ক্যানসারের লক্ষণগুলো সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারেন।

শিশুদের শরীরে ক্যানসারের কিছু ধরন দ্রুত অগ্রসর হতে পারে। ফলে প্রাথমিক লক্ষণগুলো শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব লক্ষণ দেখা দিলেই যে শিশুর ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়। সাধারণ নানা অসুস্থতার কারণেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

যেসব লক্ষণ দেখে সতর্ক হবেন

শিশুরা অনেক সময় নিজেদের শারীরিক সমস্যার কথা স্পষ্টভাবে বোঝাতে পারে না। তাই তাদের আচরণ, শারীরিক পরিবর্তন এবং দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছে কি না, সেদিকে অভিভাবকদের নজর রাখা প্রয়োজন।

শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. বব ফিলিপসের মতে, কোনো লক্ষণ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে কিংবা সময়ের সঙ্গে আরও খারাপ হলে তা অবহেলা করা উচিত নয়।

শিশুদের ক্ষেত্রে যেসব লক্ষণের দিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখা প্রয়োজন, সেগুলো হলো:

  • অতিরিক্ত ক্লান্তি: সামান্য পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে ওঠা, স্বাভাবিক কাজকর্মে আগ্রহ কমে যাওয়া কিংবা দীর্ঘ সময় অবসাদগ্রস্ত থাকা।

  • ফ্যাকাশে চেহারা: শিশুর ত্বক স্বাভাবিকের তুলনায় ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, যা রক্তস্বল্পতাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।

  • অকারণে কালসিটে বা লালচে দাগ: কোনো আঘাত ছাড়াই শরীরের বিভিন্ন স্থানে কালসিটে কিংবা অস্বাভাবিক লালচে দাগ দেখা দেওয়া।

  • শরীরে চাকা বা ফোলা অংশ: শরীরের কোথাও নতুন করে চাকা বা ফোলা দেখা দেওয়া, বিশেষ করে সেটি সময়ের সঙ্গে না কমে বরং বড় হতে থাকলে।

এসব লক্ষণ বারবার দেখা দিলে বা স্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট হলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

সাধারণ অসুস্থতা ভেবে ভুল করেন অভিভাবকেরা

ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণগুলো অনেক সময় সাধারণ ক্লান্তি, সর্দি-কাশি কিংবা স্কুলের ব্যস্ততার কারণে হওয়া অবসাদের মতো মনে হতে পারে। এ কারণে কিছু ক্ষেত্রে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হয়। তবে শুধু উপসর্গ দেখে ক্যানসার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসক রোগের কারণ নির্ধারণ করেন।

যুক্তরাজ্যের ১৩ বছর বয়সী অ্যামেলিয়ার ঘটনাটি এ বিষয়ে সতর্কতার উদাহরণ। অতিরিক্ত ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্টে ভুগলে প্রথমে মনে করা হয়েছিল, সে হয়তো শারীরিকভাবে যথেষ্ট ফিট নয়। কিন্তু পরে তার শরীরে লালচে দাগ ও কালসিটে দেখা দেওয়ায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এরপর তার লিউকেমিয়া বা ব্লাড ক্যানসার শনাক্ত হয়।

সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু হওয়ায় অ্যামেলিয়া এখন সুস্থ জীবন কাটাচ্ছে। তার ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, শিশুর শরীরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে দীর্ঘদিন অবহেলা করা ঠিক নয়।

সচেতনতাই হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ

১৯৭০-এর দশকের তুলনায় বর্তমানে শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে সময়মতো রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা শুরু হলে প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু ক্যানসার থেকে সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে রোগের ধরন, পর্যায় এবং শিশুর শারীরিক অবস্থার ওপর চিকিৎসার ফলাফল নির্ভর করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগের লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করা গেলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা শুরু করার সুযোগ বাড়ে। তাই শিশুর দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, অকারণ কালসিটে দাগ, ফ্যাকাশে চেহারা কিংবা শরীরে অস্বাভাবিক ফোলা দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।

অভিভাবকদের আতঙ্কিত না হয়ে শিশুর শারীরিক পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসা শিশুর সুস্থতার সম্ভাবনা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।