বদনজর কি সত্যিই মানুষকে অসুস্থ করে? জেনে নিন নবীজির শেখানো কার্যকরী দোয়া ও আমল

 মানুষের জীবনে হিংসা ও বিদ্বেষপ্রসূত দৃষ্টি বা ‘বদনজর’ এক নির্মম বাস্তবতা। ইসলামি জীবনাচরণে বদনজরকে কোনো অমূলক কুসংস্কার হিসেবে দেখা হয়নি; বরং এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে নিষ্পাপ ছোট শিশু এবং সফল মানুষেরা প্রায়ই অজান্তে অন্যের কুদৃষ্টির শিকার হয়ে হঠাৎ শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তবে এই ধরনের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষিত থাকতে ইসলামে রয়েছে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও শক্তিশালী আমল।

বদনজরের সত্যতা নিশ্চিত করে স্বয়ং বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রভাব থেকে বেঁচে থাকার তাগিদ দিয়েছেন। হাদিস শরিফে তিনি ইরশাদ করেন, ‘তোমরা বদনজরের প্রভাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর। কেননা নজরের প্রভাব সত্য।’ (ইবনে মাজাহ: ৩৫০৮)।

পবিত্র কোরআনেও বদনজরের অস্তিত্ব ও এর মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সুরা আল-কলমের ৫১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘কাফেররা যখন উপদেশবাণী শোনে তখন তারা যেন তাদের দৃষ্টির মাধ্যমে তোমাকে আছড়ে ফেলবে, আর তারা বলে, এ তো এক পাগল।’

প্রখ্যাত মুফাসসির আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত—আয়াতে উল্লিখিত ‘দৃষ্টির মাধ্যমে তোমাকে আছড়ে ফেলবে’ কথাটির প্রকৃত অর্থ হলো ‘তোমার প্রতি বদনজর দেবে।’ অর্থাৎ আল্লাহর বিশেষ সুরক্ষা না থাকলে হিংসুকদের তীব্র কুদৃষ্টি মানুষকে গুরুতর রোগী বানিয়ে ফেলতে পারে। এই আয়াতটি দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করে যে, বদনজরের কুপ্রভাবে মানুষের স্বাস্থ্যহানি বা অসুস্থ হয়ে পড়া এক চরম সত্য। (তাফসিরে ইবনে কাসির: ৪/৪১০)।

সন্তান ও পরিবারের সুরক্ষায় নবীজির (সা.) শেখানো দোয়া:
রসুলুল্লাহ (সা.) প্রায়শই শিশুদের পরম স্নেহে কোলে তুলে নিয়ে বিভিন্ন দোয়া পড়ে ফুঁ দিতেন। হাদিস অনুযায়ী, প্রিয় দৌহিত্র হজরত হাসান ও হুসাইনকে (রা.) তিনি নিয়মিত নিচের দোয়াটি পড়ে ঝাড়-ফুঁক করতেন:

أُعِيْذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَّهَامَّةٍ وَّمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لاَمَّةٍ

উচ্চারণ: উয়িযুকুমা বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন কুল্লি শাইতানিন ওয়া হাম্মাতিন ওয়া মিন কুল্লি আইনিন লাম্মাতিন।
অর্থ: ‘সকল শয়তান, কীটপতঙ্গ ও বদনজর হতে তোমাদেরকে আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ কালেমাসমূহের আশ্রয়ে দিচ্ছি।’

বদনজর ও অসুস্থতা দূর করার বিশেষ আমল:
কারও ওপর বদনজর লাগলে বা অসুস্থ হয়ে পড়লে তা নিরাময়েও রয়েছে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। হজরত আবু সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সা.) একবার অসুস্থতায় আক্রান্ত হলে প্রধান ফেরেশতা হজরত জিবরাইল (আ.) তাঁর কাছে এসে জানতে চান, ‘হে মুহাম্মদ, আপনি কি অসুস্থতা বোধ করছেন?’ নবীজি (সা.) জবাবে ‘হ্যাঁ’ বললে জিবরাইল (আ.) তাৎক্ষণিকভাবে এই দোয়াটি পড়ে তাঁকে ঝাড়-ফুঁক করেন:

بِاسْمِ اللهِ أَرْقِيكَ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللهُ يَشْفِيكَ بِاسْمِ اللهِ أَرْقِيكَ.

উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আরকিকা মিন কুল্লি শাইয়িন ইউজিকা মিন শাররি কুললি নাফসিন আউ আইনিন হাসিদিন, আল্লাহু ইয়াশফিকা বিসমিল্লাহি আরকিকা।
অর্থ: ‘আল্লাহর নামে আপনাকে ফুঁ দিচ্ছি; যেসব জিনিস আপনাকে কষ্ট দেয়, সেসব প্রাণের অনিষ্ট কিংবা হিংসুকের বদনজর থেকে আল্লাহ আপনাকে শিফা দিন; আল্লাহর নামে আপনাকে ফুঁ দিচ্ছি।’ (সহিহ মুসলিম: ৫৫১২)।

ইসলামিক স্কলারদের মতে, কোনো ব্যক্তি বদনজরে আক্রান্ত হলে এই দোয়াটি নিয়মিত পাঠ করে শরীরে ফুঁ দিলে ইনশাআল্লাহ দ্রুত আরোগ্য লাভ হয়। বিশেষ করে অবুঝ শিশুদের সুরক্ষায় ও হঠাৎ অসুস্থতা কাটাতে এই দোয়াটি অত্যন্ত কার্যকরী।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।