বাংলার মসনদ কার? কোচবিহার থেকে বোলপুর-তৃণমূল ও বিজেপির হেভিওয়েট লড়াইয়ে তপ্ত রাজনৈতিক ময়দান

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজ্যের রাজনৈতিক আবহাওয়া। ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস এবং প্রধান বিরোধী দল বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের বাকযুদ্ধে এখন সরগরম বাংলার প্রতিটি নির্বাচনী ময়দান। বৃহস্পতিবার উত্তর থেকে দক্ষিণ-রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে প্রচার চালিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিজেপির দুই হেভিওয়েট মুখ উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ও আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আর আক্রমণাত্মক স্লোগানে ভোটের উত্তাপ যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।


বৃহস্পতিবার কোচবিহারের মাথাভাঙ্গায় এক জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি বিজেপিকে দেশভাগের কারিগর হিসেবে অভিযুক্ত করেন। তিনি কড়া সুরে বলেন, "বিজেপি এখন সারা বাংলায় মিথ্যার বেসাতি শুরু করেছে। তারা দেশকে টুকরো করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।" বিজেপিকে ‘বাঙালিবিরোধী’ ও ‘আদিবাসী-হিন্দুবিরোধী’ শক্তি হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, ভিনরাজ্যে কর্মরত বাংলার শ্রমিকেরা বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে প্রতিনিয়ত লাঞ্ছিত হচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের উদাসীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।


ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) এবং এনআরসি আতঙ্ক উসকে দিয়ে মমতা বলেন, এটি গণতন্ত্রের জন্য এক বড় বিপদ। বিজেপি নেতাদের ‘বসন্তের কোকিল’ বলে ব্যঙ্গ করে তিনি বলেন, "ভোট এলেই ওদের দেখা যায়, ভোট গেলে আর খোঁজ থাকে না। বাংলার মানুষ এবার ওদের প্রত্যাখ্যান করবে।" আগামী ৪ মে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর বিজেপির ‘মুখোশ’ খুলে যাবে বলে তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে ঘোষণা করেন। একইসঙ্গে তিনি ছিটমহল বিনিময়ের ঐতিহাসিক সাফল্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, তাঁর সরকারই কয়েক দশকের দীর্ঘ সমস্যার সমাধান করে মানুষের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করেছে। জনসভা থেকে তিনি ‘বিজেপি হটাও, বাংলা বাঁচাও’ স্লোগান দিয়ে দিল্লি দখলের লড়াইয়ের ডাক দেন।


অন্যদিকে, মমতার এই আক্রমণের বিপরীতে তীব্র পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছেন বিজেপির দুই স্টার ক্যাম্পেইনার। আলিপুরদুয়ারের হাসিমারায় এক জনসভায় আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা অভিযোগ করেন যে, তৃণমূল কংগ্রেস বাংলাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি দাবি করেন, "আসাম থেকে বিতাড়িত অনুপ্রবেশকারীদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বাংলায় আশ্রয় দিয়ে আদর করছেন।" চা-শ্রমিকদের বঞ্চনার কথা উল্লেখ করে তিনি রাজ্যে একটি ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।


বোলপুরের জনসভায় উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘তোষণ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি’র অভিযোগ তোলেন। বাংলাকে ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে উল্লেখ করে তিনি আক্ষেপের সাথে বলেন যে, বর্তমান সরকারের কারণে এই রাজ্য আজ দেউলিয়া হওয়ার পথে। রাজ্যে শান্তি ফেরাতে কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, "যদি প্রয়োজন হয়, তবে যোগী সরকারের কাছ থেকে বুলডোজার ধার নিয়ে এসে এখানে অরাজকতা বন্ধ করা হোক।" ভোট জালিয়াতি ও গুন্ডাতন্ত্র বন্ধ করতে এবং একটি ‘সোনার বাংলা’ গড়তে বিজেপির জয় নিশ্চিত করার জন্য তিনি ভোটারদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।

 

উভয় পক্ষের এমন মারমুখী প্রচারণায় স্পষ্ট যে, এবারের নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি দুই ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের চরম সংঘাতের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। কোচবিহার থেকে আলিপুরদুয়ার, আর বোলপুর থেকে দিনহাটা-সর্বত্রই এখন আলোচনার কেন্দ্রে কে বসবে বাংলার মসনদে?


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।