দেশের বর্তমান জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির অন্যতম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হামের (Measles) সংক্রমণ। বিশেষ করে হামে আশঙ্কাজনক হারে শিশুমৃত্যু, ভ্যাকসিনের তীব্র সংকট এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের দীর্ঘদিনের বকেয়া বেতন নিয়ে আজ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। জবাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্বীকার করলেও তা দ্রুত সামাল দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
আজ বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হলে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এক জরুরি নোটিশের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতের এই নাজুক চিত্র তুলে ধরেন রুমিন ফারহানা। তিনি অভিযোগ করেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে যে শূন্যতা বা ‘গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে, তা পূরণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে গত দেড় বছরে নতুন করে ভ্যাকসিনের কোনো ‘অর্ডার’ দেওয়া হয়নি। এছাড়া টিকা পরিবহন ও সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের (পোর্টার) গত ৯ মাসের বেতন বকেয়া থাকায় মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। রুমিন ফারহানা জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে একটি এলাকায় হামের মহামারি ঠেকাতে ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ এমআর (হাম-রুবেলা) ভ্যাকসিন দেওয়া বাধ্যতামূলক, যা বর্তমানে ঝুঁকির মুখে।
হামের বর্তমান সংক্রমণের ভয়াবহতা উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা বলেন, “বিশ্বজুড়ে হামের প্রকোপ ৭৯ শতাংশ বেড়েছে, যার ঢেউ বাংলাদেশেও আছড়ে পড়েছে। ঢাকা ও এর আশপাশের ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকাগুলো এখন সংক্রমণের হটস্পটে পরিণত হয়েছে।” তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, ১৫ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ৯৮ জন শিশুর সন্দেহজনক মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামের কারণে। এমনকি ইপিআইয়ের (EPI) কেন্দ্রীয় গুদামে বেশ কিছু টিকার মজুত ‘শূন্য’ হয়ে যাওয়ার তথ্যও তিনি তুলে ধরেন।
সংসদ সদস্যের এই উদ্বেগের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “উদ্বেগের বিষয়টি যৌক্তিক হলেও সরকার হাত গুটিয়ে বসে নেই।” তিনি স্বীকার করেন যে, আগেকার ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ও অব্যবস্থাপনার কারণে ভ্যাকসিনের কিছুটা ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তবে বর্তমানে মজুত ‘স্থিতিশীল’ পর্যায়ে রয়েছে। মন্ত্রী জানান, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) অব্যবহৃত ৬০৪ কোটি টাকা পুনর্নির্ধারণ করে জরুরি ভিত্তিতে ভ্যাকসিন সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৪১৯ কোটি টাকার ভ্যাকসিন ক্রয় প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে, যার মধ্যে ২০০ কোটি টাকার চালান দেশে এসে পৌঁছেছে। টেন্ডার প্রক্রিয়ার দুর্নীতি ও সময়ক্ষেপণ এড়াতে সরাসরি ইউনিসেফের (UNICEF) মাধ্যমে এই ভ্যাকসিন আনা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও জানান, পোর্টারদের বকেয়া বেতন আগামী দু-এক দিনের মধ্যে পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করা শুরু হবে। রাজধানীসহ সারা দেশের ১৮টি জেলার নির্দিষ্ট উপজেলাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে বরগুনা, বরিশাল, ঝালকাঠি, চাঁদপুর, কক্সবাজার, মুন্সিগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গাজীপুর, যশোর, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, পাবনা, রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর এবং ঢাকার নবাবগঞ্জ। ৫ এপ্রিল থেকেই বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে এবং ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ বড় শহরগুলোতে ‘ক্যাম্পেইন’ জোরদার করা হবে। ৩ মে থেকে দেশজুড়ে এই কার্যক্রম চালানোর কথা থাকলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় তা এগিয়ে আনা হয়েছে।
আলোচনার এক পর্যায়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, মহাখালীর সংক্রামক রোগ হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের ওয়ার্ড পরিদর্শনে গিয়ে একটি শিশুর মৃত্যু দেখে তিনি নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। তবে রুমিন ফারহানার দেওয়া মৃত্যুর পরিসংখ্যান নিয়ে কিছুটা দ্বিমত পোষণ করে মন্ত্রী দাবি করেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী এ পর্যন্ত হামের কারণে ৪১ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে। তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করে বলেন, পর্যাপ্ত ‘কোল্ড চেইন’ বজায় রেখে এবং ‘সিঙ্গেল ডোজ ভায়াল’ থেকে ‘মাল্টিডোজ ভায়ালে’ স্থানান্তরের মাধ্যমে টিকার সরবরাহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা এখন অনেক বেশি মজবুত।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।