দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে পরিবর্তনের যে জোর হাওয়া বইছে, তার ঢেউ এবার আছড়ে পড়ল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও। দীর্ঘদিনের পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে বিসিবির বোর্ড পরিচালক পদে নারী ক্রিকেটারদের অন্তর্ভুক্তির এক সাহসী ও সময়োপযোগী দাবি তুলেছেন জাতীয় দলের সাবেক সফল অধিনায়ক রুমানা আহমেদ। তাঁর মতে, দেশের নারী ক্রিকেটের সামগ্রিক উন্নয়ন ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে নীতিনির্ধারণী টেবিলে নারীদের উপস্থিতি এখন সময়ের দাবি।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) জনপ্রিয় ক্রিকেটভিত্তিক পোর্টাল ‘ক্রিকবাজ’-এর সাথে আলাপকালে রুমানা আহমেদ তাঁর এই স্বপ্নের কথা জানান। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, বিসিবির বোর্ড অফ ডিরেক্টরস-এ যদি সাবেক কোনো নারী ক্রিকেটারকে যুক্ত করা হয়, তবে তা কেবল মাঠের ক্রিকেট নয়, বরং প্রশাসনিক স্তরেও নারীদের অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করতে এক যুগান্তকারী ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বর্তমানে দেশের ক্রিকেটের ক্রান্তিলগ্নে বিসিবির অন্তর্বর্তীকালীন কার্যক্রম পরিচালনা করছে তামিম ইকবালের নেতৃত্বাধীন ১১ সদস্যের একটি শক্তিশালী অ্যাড-হক কমিটি। সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত কমিটি ভেঙে দেওয়ার পর আগামী জুনের মাঝামাঝি সময়ে একটি নতুন নির্বাচনের তোড়জোড় চলছে। ঠিক এই সন্ধিক্ষণেই রুমানা আহমেদের এই প্রস্তাব দেশের ক্রিকেট মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বোর্ডে নারীদের প্রতিনিধিত্বের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রুমানা বলেন, ‘অনেকের মুখেই এখন আলোচনা শুনছি যে বিসিবির পরিচালক পদে অন্তত একজন নারী ক্রিকেটারের থাকা উচিত। আমাদের খেলোয়াড়দের মাঝেও এমন একটা সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে। এর কারণও খুব স্পষ্ট; নারী ক্রিকেটের গভীরে যেসব সূক্ষ্ম সমস্যা রয়েছে, সেগুলো একজন নারী ক্রিকেটারের পক্ষেই সবচেয়ে ভালো অনুধাবন করা সম্ভব।’
উল্লেখ্য, বিসিবির বর্তমান গঠনতন্ত্র অনুযায়ী মোট ২৫ জন পরিচালক নির্বাচিত হয়ে আসেন। এর মধ্যে ১২ জন আসেন বিভিন্ন ক্লাব ক্যাটাগরি থেকে, ১০ জন জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় থেকে, ২ জন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) কর্তৃক মনোনীত এবং বাকি ১ জন আসেন ক্যাটাগরি-৩ (সাবেক ক্রিকেটার ও অন্যান্য সংস্থা) থেকে। তবে এই বিশাল কাঠামোতে নারী ক্রিকেটারদের জন্য আলাদা কোনো নির্দিষ্ট কোটা বা সংরক্ষিত পদের ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত রাখা হয়নি।
রুমানা আহমেদ নিজেও বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি জানেন, বর্তমান গঠনতন্ত্র সংশোধন করা ছাড়া এই দাবি বাস্তবায়ন করা বেশ জটিল একটি প্রক্রিয়া। বিশেষ করে আইনি বাধ্যবাধকতা এবং দীর্ঘদিনের চলে আসা নিয়মের বেড়াজাল ছিঁড়ে নতুন কাউকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রায় অসম্ভব বললেই চলে। তবে তিনি হাল ছাড়তে রাজি নন। পুরুষ ক্রিকেটে সাবেক তারকাদের বোর্ড পরিচালনায় আসার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘ছেলেরা যেহেতু তাঁদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বোর্ডে অবদান রাখার সুযোগ পাচ্ছেন, মেয়েদের ক্ষেত্রেও সেই একই সুযোগ থাকা উচিত। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে নিজে থেকে চেয়ে খুব একটা ফল পাওয়া যায় না; বোর্ড যদি আগ বাড়িয়ে প্রস্তাব দেয়, তবেই বিষয়টি পূর্ণতা পেতে পারে।’
বর্তমানে তামিম ইকবালের নেতৃত্বাধীন অ্যাড-হক কমিটি আইনি পরামর্শক দলের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। আগামী নির্বাচন কোন প্রক্রিয়ায় হবে কিংবা গঠনতন্ত্রে বৈপ্লবিক কোনো রদবদল আসবে কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে রুমানাদের এই স্বপ্ন বাস্তব রূপ পাবে কি না। বিসিবির ইতিহাসে নারী পরিচালক আসার বিষয়টি হবে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। তবে সেই ইতিহাস গড়ার পথে এখন প্রধান অন্তরায় সময় ও আইনি প্রক্রিয়া। দেশের কোটি ক্রিকেটপ্রেমী এখন গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, বিসিবির আগামীর নেতৃত্বে কোনো নতুন চমক দেখা যায় কি না।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া