এপস্টেইন ফাইলস প্রকাশ: ক্ষমতাধরদের অন্ধকার জগতের লোমহর্ষক সব তথ্য ফাঁস!

এপস্টেইন ফাইলস প্রকাশ: ক্ষমতাধরদের অন্ধকার জগতের লোমহর্ষক সব তথ্য ফাঁস!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে আলোচিত ও বিতর্কিত মার্কিন ধনকুবের জেফরি এপস্টেইনের অন্ধকার জগতের নতুন নতুন সব চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘এপস্টেইন ফাইলস’ বিশ্ব রাজনীতি ও বিনোদন জগতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে। এই নথিগুলো প্রয়াত এই অর্থলগ্নিকারীর রহস্যময় জীবন ও তাঁর গড়ে তোলা যৌনবৃত্তির বিশাল নেটওয়ার্ক সম্পর্কে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

১৯৮২ সালে নিজের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘জে এপস্টেইন অ্যান্ড কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জেফরি এপস্টেইনের জয়যাত্রা শুরু হলেও, তাঁর আড়ালের জীবন ছিল ভয়াবহ অপরাধে ঘেরা। ২০১১ সালে নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এপস্টেইন নিজেকে একজন নির্দোষ অপরাধী হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বিদ্রূপাত্মক স্বরে বলেছিলেন, ‘আমি কোনো যৌন নিপীড়ক নই, আমি স্রেফ একজন অপরাধী। একজন খুনি আর ব্যাগেল (পাউরুটি–জাতীয় খাবার) চোরের মধ্যে যে তফাৎ, আমার অপরাধটিও তেমনই সাধারণ।’ তবে তাঁর এই দাবির সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল খুঁজে পাননি তদন্তকারীরা।

যৌন পাচার ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগে ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট নিউইয়র্কের একটি কারাগারে বন্দি অবস্থায় এপস্টেইনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। এর আগেও ২০০৮ সালে তিনি এক অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে যৌনকর্মে প্ররোচিত করার দায়ে অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। সেই সময় থেকেই তাঁকে দুর্ধর্ষ ‘যৌন নিপীড়ক’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।

২০২৫ সালের নভেম্বরে মার্কিন কংগ্রেসে ‘এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’ বিলটি পাস হওয়ার পর দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যায়। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বিলে স্বাক্ষর করার পরপরই বিচার বিভাগ এপস্টেইনের জীবনের সমস্ত অপরাধমূলক তদন্তের ফাইল জনসমক্ষে প্রকাশের অনুমতি পায়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, এই তথ্যগুলো ‘অনুসন্ধান ও ডাউনলোড উপযোগী ফরম্যাটে’ প্রকাশ করা হচ্ছে, যার ফলে লাখ লাখ পৃষ্ঠার নথিপত্র এখন সাধারণ মানুষের নাগালে। এর ধারাবাহিকতায় গত ৩ ডিসেম্বর ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসে এপস্টেইনের বিলাসবহুল প্রাসাদের ভেতরে ধারণকৃত দুর্লভ কিছু ছবিও প্রকাশ করেছে হাউস ওভারসাইট কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্যরা। সেসব ছবিতে দেখা গেছে অদ্ভুত সব শয়নকক্ষ, যার দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা ছিল গা ছমছমে সব মুখোশ।

এপস্টেইনের উত্থান রূপকথার চেয়েও কম কিছু ছিল না। নিউইয়র্কে বেড়ে ওঠা এই ব্যক্তি সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে শহরের বিখ্যাত প্রাইভেট ডাল্টন স্কুলে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান পড়াতেন। যদিও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি, তবুও ওয়াল স্ট্রিটের প্রভাবশালী বিনিয়োগ ব্যাংক ‘বিয়ার স্টিয়ার্নস’-এর অংশীদার হয়ে ওঠেন মাত্র চার বছরের মাথায়। ১৯৮২ সালে নিজের কোম্পানি খোলার পর তিনি শত কোটি ডলারের সম্পদ ব্যবস্থাপনা শুরু করেন। ফ্লোরিডায় প্রাসাদ, নিউ মেক্সিকোতে বিশাল খামার আর নিউইয়র্কের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত বাড়ির মালিক হয়ে তিনি প্রভাবশালী রাজনীতিক ও তারকাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হন।

বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একসময় তাঁর ঘনিষ্ঠদের তালিকায় ছিলেন। ২০০২ সালে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প তাঁকে ‘দারুণ মানুষ’ এবং সুন্দরী নারীদের রসজ্ঞ বলে অভিহিত করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে ট্রাম্প দাবি করেন যে, এপস্টেইনের প্রথম গ্রেপ্তারের আগেই তাঁদের সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, নারী কর্মীদের সঙ্গে অশোভন আচরণের দায়ে ট্রাম্প একসময় এপস্টেইনকে তাঁর ক্লাব থেকে বহিষ্কার করেছিলেন।

এপস্টেইনের বন্ধুত্বের বৃত্তে ছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, অভিনেতা কেভিন স্পেসি এবং ক্রিস টাকারের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা। ব্রিটিশ রাজনীতিক পিটার ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের জেরে ২০২৫ সালে ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পদ থেকে সরে যেতে হয়েছে এবং তিনি ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি থেকেও বহিষ্কৃত হয়েছেন।

সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরকে নিয়ে। এপস্টেইনের সঙ্গে বন্ধুত্বের দায়ে ২০২৫ সালে তাঁর ‘যুবরাজ’ উপাধি বাতিল করা হয়। ভার্জিনিয়া রবার্টস নামের এক ভুক্তভোগীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কের অভিযোগে অ্যান্ড্রু শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে আইনি সমঝোতা করতে বাধ্য হন।

এপস্টেইনের এই পৈশাচিক কর্মকাণ্ডে সবচেয়ে বড় সহযোগী ছিলেন তাঁর সাবেক প্রেমিকা গিলেন ম্যাক্সওয়েল। ২০২১ সালে নিউইয়র্কের একটি আদালত গিলেনকে কিশোরীদের যৌনদাসী হিসেবে পাচার ও প্রলোভন দেখানোর দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয়। দণ্ডাদেশ ঘোষণার পর গিলেন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘এপস্টেইনের সঙ্গে পরিচিত হওয়াটাই ছিল তাঁর জীবনের চরম ভুল।’ যদিও তিনি সাজার বিরুদ্ধে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছিলেন, তবে আদালত তাঁর সেই আবেদন সরাসরি খারিজ করে দিয়েছে।

জেফরি এপস্টেইন মারা গেলেও তাঁর রেখে যাওয়া অপরাধের ক্ষত এবং ‘এপস্টেইন ফাইলস’-এর নথিপত্রগুলো আজও বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার অপব্যবহার ও নৈতিক অবক্ষয়ের এক করুণ দলিল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।