ট্রান্স-আটলান্টিক প্রতিরক্ষা জোট বা ন্যাটোর (NATO) অন্দরে এখন এক অস্থির সময় পার করছে ইউরোপ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর ইউরোপে মার্কিন সেনা মোতায়েন নিয়ে একের পর এক নাটকীয় ও দ্রুত পরিবর্তনশীল সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের মিত্রদের চরম উদ্বেগের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ন্যাটোর মিত্রদেশগুলোকে আশ্বস্ত করতে এবং মার্কিন অবস্থান পরিষ্কার করতে উদ্যোগী হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
সুইডেনের হেলসিংবার্গে গতকাল শুক্রবার অনুষ্ঠিত ন্যাটো পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে রুবিও এই সংকট নিরসনের চেষ্টা করেন। ঠিক এর আগের দিনই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ পোল্যান্ডে ৫ হাজার অতিরিক্ত মার্কিন সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেন। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এর মাত্র এক সপ্তাহ আগেই পেন্টাগন পোল্যান্ডে ৪ হাজার সেনা পাঠানোর একটি পূর্বপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত বাতিল করেছিল। একই সাথে জার্মানি থেকেও ৫ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প, যা ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে চরম বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে মার্কো রুবিও মিত্রদের সংশয় কাটানোর চেষ্টা করে বলেন, ‘বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির বর্তমান সমীকরণ এবং আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে নিয়মিতভাবে সেনা উপস্থিতি পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং আমাদের মিত্রদের সাথে সমন্বয় করেই তা করা হচ্ছে।’ তবে রুবিও অকপটে স্বীকার করেন যে, দ্রুত বদলাতে থাকা এই ঘোষণাগুলো ইউরোপীয় নেতাদের জন্য সবসময় সুখকর নয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘ন্যাটোকে যেমন ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে হবে, তেমনি এটি আমেরিকার জন্যও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।’
ট্রাম্পের এই খামখেয়ালি সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সমীকরণ কাজ করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোকির সাথে ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সখ্যতা এবং গত নির্বাচনে তাঁকে ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন পোল্যান্ডে সেনা বৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে, ইরানের সাথে চলমান সংঘাত নিয়ে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের সাথে ট্রাম্পের নীতিগত বিরোধের জেরে জার্মানি থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা এসেছে।
বর্তমানে ইউরোপে আমেরিকার সবচেয়ে বড় সামরিক উপস্থিতি রয়েছে জার্মানিতে, যেখানে ৩৬ হাজারের বেশি সেনা সক্রিয় রয়েছেন। এ ছাড়াও ইতালিতে ১২ হাজার, যুক্তরাজ্যে ১০ হাজার এবং পোল্যান্ডে প্রায় ১০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। তবে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অধীনে এই সংখ্যা ক্রমে কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে হোয়াইট হাউস। ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে এ বিষয়ে সতর্ক করে জানিয়েছেন, আগামী দিনগুলোতে ইউরোপকে প্রতিরক্ষার প্রশ্নে আমেরিকার ওপর নির্ভরতা কমানোর মানসিকতা বজায় রাখতে হবে। রুবিওর এই ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ বা ক্ষত মেরামতের মিশন ন্যাটোর ভাঙন আটকাতে কতটা সফল হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।