ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই নিজেকে ‘বিজয়ী’ হিসেবে দাবি করে আসছেন। হোয়াইট হাউসের ব্রিফিং থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া—সর্বত্রই তাঁর কণ্ঠে সাফল্যের প্রতিধ্বনি। কিন্তু যুদ্ধের তিন মাস পেরিয়ে বর্তমান বাস্তবতার সমীকরণগুলো এক ভিন্ন সংকেত দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সমরবিদদের মনে এখন একটিই বড় প্রশ্ন—ট্রাম্প কি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে আসলে হেরে যাচ্ছেন?
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ওপর কৌশলগত সাফল্যগুলো একটি বিশ্বাসযোগ্য বিজয়ে রূপান্তর করতে ট্রাম্প প্রশাসন কার্যত হিমশিম খাচ্ছে। যদিও বিমান হামলায় ইরানের বেশ কিছু শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন এবং সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে তেহরান এখনো হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে কোনো আপস না করা এবং নেতৃত্বের অবিচল ঐক্য ট্রাম্পের জয়ের দাবিকে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সাবেক মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, “মনে হচ্ছে এই যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য একটি স্বল্পমেয়াদী বিজয় হিসেবে পরিকল্পিত হলেও তা শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত ব্যর্থতায় পরিণত হতে যাচ্ছে।”
এই সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর। ইরানের ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধের বিপরীতে তেহরান যখন হরমুজ প্রণালি বন্ধের পদক্ষেপ নিয়েছে, তখন বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও সার সরবরাহে ধস নেমেছে। উল্লেখযোগ্য যে, বিশ্বের ব্যবহৃত ইউরিয়ার প্রায় ৪১ শতাংশ আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে নাইট্রোজেন ইউরিয়ার দাম অবিশ্বাস্যভাবে ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতিসংঘ এক চরম হুশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, এই সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বিশ্বে নতুন করে ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ চরম খাদ্য সংকটে পড়বে, যা বৈশ্বিক ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যাকে ৩৬ কোটি ৩০ লাখের রেকর্ড উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী কুপারও সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্ব এক বিশাল সংকটের দিকে এগোচ্ছে যা অনেকেই এখনো উপলব্ধি করতে পারছেন না।
অভ্যন্তরীণভাবেও ট্রাম্প এখন ত্রিমুখী চাপের মুখে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পেট্রোলের আকাশচুম্বী দাম এবং জনসমর্থনের অভাব, অন্যদিকে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও ফাটল দেখা দিচ্ছে। সম্প্রতি মার্কিন সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের আনা ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজ্যুলেশন’ প্রস্তাবটি ৫০-৪৭ ব্যবধানে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে, যেখানে বেশ কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটর ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার কড়া ভাষায় মন্তব্য করেছেন, “এই প্রেসিডেন্ট যেন লোড করা বন্দুক হাতে থাকা এক শিশুর মতো আচরণ করছেন।”
মিত্রদের সাথেও ট্রাম্পের সম্পর্কের টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের এক রুদ্ধশ্বাস ফোনালাপ হয়েছে। কাতার ও সৌদি আরবের অনুরোধে ইরানের ওপর নতুন হামলা স্থগিত করার সিদ্ধান্তে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন নেতানিয়াহু। তাঁর মতে, বিলম্ব মানেই ইরানের লাভ। প্রায় এক ঘণ্টার সেই ফোনালাপে নেতানিয়াহু সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর পক্ষে জোর দিলেও ট্রাম্প কূটনৈতিক দরকষাকষির পথ খোলা রাখতে চাইছেন।
এদিকে, তেহরানও তাঁদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সাফ জানিয়েছেন যে, ইরানকে জোরপূর্বক আত্মসমর্পণে বাধ্য করা একটি ‘অলীক কল্পনা’। এর মধ্যেই পারস্য উপসাগরে ‘তত্ত্বাবধান এলাকা’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যাতায়াতে নতুন অনুমতিপত্র ব্যবস্থা চালু করেছে ইরান, যা হরমুজ প্রণালির ওপর তাঁদের একক আধিপত্যের নতুন বিজ্ঞাপন। সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ কি শেষ পর্যন্ত একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে শেষ হবে, নাকি দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক বিপর্যয়ে মার্কিন আধিপত্যকে খাদের কিনারায় নিয়ে যাবে—তা দেখার অপেক্ষায় বিশ্ববাসী।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।