দক্ষিণ আফ্রিকায় অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে চলমান চরম উত্তেজনার মাঝে এক ভয়াবহ ‘জেনোফোবিক’ বা অভিবাসীবিদ্বেষী হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত পাঁচজন মোজাম্বিকান নাগরিক। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখে মোজাম্বিক সরকার প্রথমবারের মতো নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর পরিচালিত এই প্রাণঘাতী সহিংসতার সত্যতা দাপ্তরিকভাবে নিশ্চিত করেছে। মঙ্গলবার (২ জুন) মোজাম্বিক সরকারের প্রেস অফিস থেকে প্রকাশিত এক জরুরি বিবৃতিতে এই উদ্বেগজনক তথ্য জানানো হয়।
বিবৃতি অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর মোসেল বে-তে ছড়িয়ে পড়া এই রক্তক্ষয়ী দাঙ্গায় প্রায় ৮০০ মোজাম্বিকান নাগরিক চরম নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়েন। গত ৩৯ মে (রিপোর্ট অনুযায়ী) থেকে শুরু হওয়া এই তাণ্ডবে মোট সাতজন মোজাম্বিকান প্রাণ হারিয়েছেন। এদের মধ্যে পাঁচজনকে সরাসরি বর্ণবাদী ও ‘জেনোফোবিক’ হামলার মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। বাকি দুজন ওই ভয়াবহ সহিংসতা থেকে প্রাণ বাঁচাতে ব্যক্তিগত গাড়িতে করে নিজ দেশে পালিয়ে যাওয়ার সময় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। এই অরাজক পরিস্থিতির জেরে ইতিমধ্যে ৩০০ জন মোজাম্বিকান নাগরিক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে ও নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কোনোমতে প্রাণ হাতে নিয়ে স্বদেশে ফিরে গেছেন।
মোজাম্বিক সরকারের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, বর্তমানে ৫০০ জনেরও বেশি নাগরিককে দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়েস্টার্ন কেপ প্রদেশের একটি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বা ‘ক্যাম্পে’ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ১ জুন থেকে তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাবাসন বা ফিরিয়ে নেওয়ার রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া শুরু করেছে মোজাম্বিক কর্তৃপক্ষ। এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা পুলিশ জানিয়েছে, কেপটাউন থেকে ৩৮০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত মোসেল বে বন্দরের একটি বসতিতে দুই ব্যক্তির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় তারা তদন্ত শুরু করেছে। তবে এই হত্যাকাণ্ডগুলো সরাসরি দাঙ্গার অংশ কি না, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি।
ভয়াবহ এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে মোসেল বে শহরের মেয়র ডার্ক কোটজে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “দিনের আলোতে নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা এবং বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে পরিবারগুলোকে বাস্তুচ্যুত করার মতো বর্বরোচিত কর্মকাণ্ড আধুনিক সমাজে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকার বাণিজ্যিক রাজধানী জোহানেসবার্গ, ডারবান এবং ইস্টার্ন কেপ প্রদেশে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই ‘অ্যান্টি-মাইগ্রেন্ট’ বা অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভ মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আগামী নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিতব্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল জনসমর্থন আদায়ের জন্য সাধারণ ভোটারদের মধ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও অভিবাসীবিদ্বেষী ‘সেন্টিমেন্ট’ উসকে দিচ্ছে।
উল্লেখ্য, দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘জেনোফোবিক’ হামলার ইতিহাস অত্যন্ত দীর্ঘ ও কলঙ্কিত। এর আগে ২০০৮, ২০১৫ এবং ২০২১ সালেও দেশটিতে এমন ভয়াবহ দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে বহু প্রবাসী প্রাণ হারান এবং হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেখানে অবস্থানরত অন্যান্য দেশের অভিবাসীদের মধ্যেও চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।