একাধিক উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি কেলেঙ্কারি এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগে স্পেনের রাজনীতিতে এক ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের পদত্যাগের দাবিতে রাজধানী মাদ্রিদের রাজপথ এখন হাজার হাজার ক্ষুব্ধ নাগরিকের দখলে। গত শনিবার (২৩ মে) অনুষ্ঠিত এই বিশাল সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এক পর্যায়ে সহিংস রূপ নেয়, যার ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্তত সাতজন সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাতে দেশ মিডিয়ার পাঠকদের জন্য এই বিশেষ প্রতিবেদন।
‘স্প্যানিশ সিভিল সোসাইটি অ্যাসোসিয়েশন’-এর আহ্বানে আয়োজিত এই বিক্ষোভ কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘মার্চ ফর ডিগনিটি’ বা মর্যাদার পদযাত্রা। বিক্ষোভকারীরা ‘সমাজতান্ত্রিক মাফিয়ার পদত্যাগ চাই’ এবং ‘গণতন্ত্র রক্ষা করো’—এমন সব কঠোর স্লোগান সংবলিত ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে রাজপথে নেমে আসেন। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের হাতে স্পেনের লাল-সোনালি জাতীয় পতাকা শোভা পাচ্ছিল। মূলত শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি শুরু হলেও, এক পর্যায়ে উত্তেজিত জনতা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘মনক্লোয়া প্রাসাদ’-এর দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। বিক্ষোভকারীরা পুলিশের তৈরি করা নিরাপত্তা ব্যারিকেড ভেঙে ফেলার চেষ্টা করলে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।
পেশাদার সাংবাদিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে এক নাটকীয় চিত্র। স্প্যানিশ টেলিভিশনে প্রচারিত ফুটেজে দেখা গেছে, কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা একদল যুবক মনক্লোয়া প্রাসাদের দিকে যাওয়ার প্রধান সড়কটি অবরুদ্ধ করে রেখেছে। পরবর্তীতে পুলিশি অ্যাকশনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং ঘটনাস্থল থেকে অন্তত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। এই বিক্ষোভে বিরোধী দল ‘পিপলস পার্টি’ এবং কট্টর ডানপন্থী ‘ভক্স পার্টি’-র শীর্ষ নেতারা সশরীরে অংশ নিয়ে সরকারের নৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
এই গণবিক্ষোভের নেপথ্যে রয়েছে স্পেনের বিচার বিভাগীয় কিছু চাঞ্চল্যকর পদক্ষেপ। গত মঙ্গলবার স্পেনের একটি আদালত ঘোষণা দিয়েছে যে, দেশটির সাবেক সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানচেজের ঘনিষ্ঠ মিত্র হোসে লুইস রদ্রিগেজ জাপাতেরোর বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তার ও বড় ধরনের অর্থপাচার চক্র পরিচালনার অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়েছে। যদিও জাপাতেরো এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবে এটি বামপন্থী জোট সরকারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৪ সালের এপ্রিলে নিজের স্ত্রী বেগোনিয়া গোমেজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত শুরু হলে পেদ্রো সানচেজ একবার পদত্যাগের হুমকি দিয়েছিলেন। তখন তিনি এই তদন্তকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং ‘কট্টর ডানপন্থীদের ষড়যন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
বিক্ষোভের ব্যাপ্তি নিয়ে সরকার ও আয়োজকদের মধ্যে তথ্যের ব্যাপক গরমিল লক্ষ্য করা গেছে। আয়োজক সংগঠনের দাবি অনুযায়ী, রাজপথে অন্তত ৮০ হাজার মানুষ সমবেত হয়েছিলেন। তবে মাদ্রিদে স্পেন সরকারের প্রতিনিধির দেওয়া তথ্যমতে, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ হাজার। সংখ্যা যাই হোক না কেন, মাদ্রিদের রাজপথে মানুষের এই ক্ষোভ ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাওয়ের চেষ্টা নির্দেশ করছে যে, ইউরোপের এই শক্তিশালী দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।