আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর (ডিআরসি) নর্থ কিভু প্রদেশ এখন এক বিভীষিকাময় মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। দেশটির রুবায়া অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কলটান খনিতে ভয়াবহ ভূমিধসের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২০০ জনেরও বেশি মানুষ। কঙ্গোর খনি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই মহাবিপর্যয়ের খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। অত্যন্ত বেদনাদায়ক তথ্য হলো, নিহতদের মধ্যে প্রায় ৭০ জনই শিশু, যারা জীবিকার তাগিদে কিংবা পরিস্থিতির শিকারে ওই মরণফাঁদে আটকা পড়েছিল। বর্তমানে আহতদের উদ্ধার করে নর্থ কিভুর রাজধানী গোমা শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
তবে এই বিশাল প্রাণহানির কারণ নিয়ে দেশটির সরকার এবং খনি অঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণকারী বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘মার্চ ২৩ মুভমেন্ট’ (এম২৩)-এর মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ ও তথ্যযুদ্ধ শুরু হয়েছে। সরকারের দাবি, গত কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টিপাতের ফলেই এই মর্মান্তিক ভূমিধসের সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে, এম২৩-এর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ফ্যানি কাজ সরকারের এই দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না, বরং সেখানে ভয়াবহ বোমা হামলা চালানো হয়েছে এবং নিহতের সংখ্যা সরকারের দাবির চেয়ে অনেক কম। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, ‘মানুষ যা প্রচার করছে তা সত্য নয়; এখানে বোমা হামলা হয়েছে এবং মাত্র পাঁচজন প্রাণ হারিয়েছেন।’
বিদ্রোহীদের এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন খনিতে কর্মরত প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিকরা। ইব্রাহিম তালুসেকের মতো সাধারণ শ্রমিকরা জানিয়েছেন, তাঁরা নিজ হাতে দুর্ঘটনাস্থল থেকে ২০০টিরও বেশি মরদেহ উদ্ধার করতে সহায়তা করেছেন। বার্তা সংস্থা ‘অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইব্রাহিম বলেন, ‘আমরা প্রচণ্ড আতঙ্কে আছি। খনির গর্তগুলোর মালিকেরা প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ না করার জন্য আমাদের ওপর চাপ দিচ্ছে।’ উল্লেখ্য, রুয়ান্ডা-সমর্থিত বিদ্রোহী জোট এএফসি ও এম২৩ ২০২৪ সাল থেকেই এই খনিটির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বিশ্বের খনিজ বাজারে রুবায়া খনিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থান দখল করে আছে। বিশ্বজুড়ে উৎপাদিত কলটানের প্রায় ১৫ শতাংশই সরবরাহ করা হয় এই খনি থেকে। এই কলটান থেকে প্রাপ্ত ‘ট্যানটালাম’ ধাতু আধুনিক বিশ্বের অপরিহার্য প্রযুক্তি পণ্য যেমন—স্মার্টফোন, কম্পিউটার, মহাকাশ গবেষণার যন্ত্রাংশ এবং গ্যাস টারবাইন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ, আধুনিক প্রযুক্তির চাকচিক্যের আড়ালে কঙ্গোর এই খনিগুলোতে শ্রমিকদের জীবন প্রতিনিয়ত ঝুঁকিতে থাকে। চলতি বছরের জানুয়ারিতেও একই স্থানে ভারী বৃষ্টির পর খনি ধসে প্রায় ২০০ জন নিহত হয়েছিলেন, যার জন্য সরকার অবৈধ খনন কার্যক্রম এবং বিদ্রোহীদের খামখেয়ালিকেই দায়ী করেছিল। তিল তিল করে গড়ে ওঠা এই মৃত্যু উপত্যকায় লাশের সারি দীর্ঘ হলেও পরিস্থিতির কোনো স্থায়ী সমাধান এখনো দৃশ্যমান নয়।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।