গাজীপুরের কালীগঞ্জে পল্লী বিদ্যুতের নজিরবিহীন অব্যবস্থাপনা ও চরম অবহেলার বলি হলেন এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। গত মঙ্গলবার (৫ মে) বিকেলে টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়কের শিমুলিয়া এলাকায় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের অন্তত ১৪টি সিমেন্টের খুঁটি হঠাৎ উপড়ে সড়কের ওপর পড়ে গেলে এই মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় একজন স্কুল শিক্ষিকা নিহত হওয়ার পাশাপাশি আরও দুইজন আরোহী গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের অবস্থা বর্তমানে আশঙ্কাজনক।
নিহত শিক্ষিকার নাম শিউলি বেগম (৪৫)। তিনি শিমুলিয়া এলাকার মৃত হাসেন সরকারের মেয়ে এবং তুমুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই সন্তানের জননী। এ ঘটনায় আহতরা হলেন— বক্তারপুর এলাকার কিশোর তন্ময় (১৬) ও তুমুলিয়া মিশন এলাকার পূজা রানী দেবনাথ (২০)। তাঁদের উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলেও পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বিকেলে শিমুলিয়া এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের একটি সাবস্টেশন সংলগ্ন একটি খুঁটি আকস্মিকভাবে ভেঙে সড়কের ওপর পড়ে। ঠিক সেই মুহূর্তেই বৈদ্যুতিক তারের তীব্র টানে লাইনের সঙ্গে যুক্ত আরও অন্তত ১৩ থেকে ১৪টি খুঁটি ‘ডমিনো ইফেক্ট’-এর মতো একে একে ভেঙে পড়তে শুরু করে। এ সময় একটি চলন্ত অটোরিকশার ওপর একটি ভারী খুঁটি আছড়ে পড়লে ভেতরে থাকা যাত্রীরা পিষ্ট হন। খুঁটিগুলো উপড়ে পড়ার সময় তারে তারে ঘর্ষণে বিকট শব্দে ‘শর্ট সার্কিট’ হতে শুরু করলে পুরো এলাকায় এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে চরম আতঙ্ক।
দুর্ঘটনার পর গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে অন্তত তিন ঘণ্টা যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। দীর্ঘ সময় সড়কের দুই পাশে কয়েক শ যানবাহন আটকে থাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে সন্ধ্যা ৭টার দিকে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত খুঁটি ও তার অপসারণ করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, কয়েক বছর আগেও এই এলাকায় একযোগে ১০টি খুঁটি হেলে পড়ার ঘটনা ঘটেছিল, কিন্তু কর্তৃপক্ষ তখন কোনো কার্যকর স্থায়ী সমাধান নেয়নি।
বিদ্যুৎ বিভাগের কারিগরি বিধিমালা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই দুর্ঘটনার নেপথ্যে ছিল চরম প্রকৌশলগত ত্রুটি ও নিয়ম লঙ্ঘন। নিয়ম অনুযায়ী, একটি খুঁটির মোট দৈর্ঘ্যের অন্তত এক-ষষ্ঠাংশ মাটির গভীরে স্থাপন করার কথা। অর্থাৎ ৫০-৬০ ফুট লম্বা খুঁটিগুলো অন্তত ১০ ফুট গভীরে পোঁতার কথা থাকলেও বাস্তবে সেগুলো মাত্র ৩ থেকে ৪ ফুট গভীরে বসানো হয়েছিল। বর্ষার শুরুতে মাটি কিছুটা নরম হওয়ায় এমন নড়বড়ে খুঁটিগুলো তারের ভার সইতে না পেরে উপড়ে পড়ে।
কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাকির হোসেন এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, একজন শিক্ষিকার অকাল মৃত্যু ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার এই ঘটনায় একটি মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে ঘটনার বিষয়ে কালীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএম মো. আক্তার হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এই নির্মম অবহেলার বিচার এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে কালীগঞ্জের সচেতন মহল।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।