মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান ভয়াবহতা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। সপ্তাহের শুরুর দিন সোমবার সকালেই এশীয় বাজারে কেনাবেচা শুরু হওয়ার পর জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করেছে। বিশ্লেষকরা যে আশঙ্কার কথা গত কয়েক দিন ধরে বলছিলেন, আজ সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম রেকর্ড ১১৫ ডলারে উঠে আসায় সেই আতঙ্কই এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। যুদ্ধের এই উত্তাপ কেবল জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর ধাক্কায় এশিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে সূচকের নজিরবিহীন পতন ঘটেছে।
অয়েল প্রাইস ডট কমের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক লাফে ২২ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৫ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে মার্কিন ডব্লিউটিআই (WTI) ক্রুড তেলের দামও ২২ শতাংশ বেড়ে ১১৩ দশমিক ৪০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া মারাবান ক্রুডের দাম ১২০ ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। মূলত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেলপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ দীর্ঘ সময়ের জন্য অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই বাজারের এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ওপেকের তিন বড় উৎপাদক দেশ—ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত ইতিমধ্যে তেল উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে (সাপ্লাই চেইন) আরও সংকুচিত করে তুলছে।
বাজারের এই অস্থিরতার সাথে তাল মিলিয়ে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শেয়ারবাজারগুলোতে ধস নেমেছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ৭ শতাংশের বেশি কমেছে এবং হংকংয়ের হ্যাংসেং সূচক পড়েছে ৩ শতাংশের বেশি। সবচাইতে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে দক্ষিণ কোরিয়ায়; সেখানে কোসপি (KOSPI) সূচক ৮ শতাংশের বেশি পড়ে গেলে বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত বিক্রি ঠেকাতে ২০ মিনিটের জন্য লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ বা ‘সার্কিট ব্রেকার’ জারি করতে হয়। অস্ট্রেলিয়ার এএসএক্স ২০০ সূচকও ৪ শতাংশের বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। গত শনি ও রোববার ইরানের বিভিন্ন জ্বালানি অবকাঠামো ও তেলের ডিপোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা বিনিয়োগকারীদের মনোবল পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, তেলের দাম প্রতি ১০ শতাংশ বৃদ্ধির বিপরীতে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়বে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ এবং এর ফলে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমবে শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ। ওয়াশিংটনভিত্তিক অর্থনীতিবিদ আদনান মাজরেই মনে করেন, যদি মার্চের শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকে, তবে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে এক নতুন ইতিহাস গড়তে পারে। তাঁর মতে, অনেকেই এখন বুঝতে শুরু করেছেন যে এই যুদ্ধ নিকট ভবিষ্যতে থামার কোনো সম্ভাবনা নেই।
এত বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, স্বল্প মেয়াদে তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি বড় কোনো বিষয় নয়। ইরানের পারমাণবিক হুমকি থেকে বিশ্বকে মুক্ত করতে এই ‘সামান্য মূল্য’ দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের জ্বালানিমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইরানের তেল অবকাঠামোতে মূলত ইসরায়েল হামলা চালাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র নয়। তবে দায় যারই হোক, জ্বালানি তেলের এই অনিয়ন্ত্রিত দাম শেষ পর্যন্ত জেট ফুয়েল থেকে শুরু করে সার উৎপাদন এবং নিত্যপণ্যের দাম বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।