মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে বারুদের গন্ধ যেন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকেই প্রতিশোধের নেশায় উন্মত্ত তেহরান এবার এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে হত্যার জন্য বিপুল অংকের অর্থ পুরস্কার বা ‘মাথার দাম’ নির্ধারণের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু করেছে ইরান। ইরানের পার্লামেন্টে এই সংক্রান্ত একটি বিশেষ বিল নিয়ে বর্তমানে ভোটাভুটির প্রস্তুতি চলছে, যা বিশ্ব রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা তৈরি করেছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ইরানের জাতীয় পার্লামেন্টে উত্থাপিত এই বিলের আওতায় ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে হত্যার জন্য ৫০ মিলিয়ন ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬৪০ কোটি টাকার বেশি) পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর পারস্পরিক পদক্ষেপ’ শীর্ষক এই বিলটি পাসের মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থাকে এই পুরস্কার প্রদানের একটি আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। এর আগে তেহরানের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় ধর্মীয় ফতোয়া বা মৌখিক হুমকি দেওয়া হলেও, এবারই প্রথম কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে এমন ‘ডেথ ওয়ারেন্ট’ আনুষ্ঠানিক সংসদীয় আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
ইরানের নীতিনির্ধারকদের দাবি, গত ২৮ ফেব্রুয়ারির যে হামলায় খামেনি নিহত হন, তার নেপথ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার সরাসরি জড়িত। জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের অন্যতম সদস্য মাহমুদ নাবাবিয়ান জানিয়েছেন, খুব শীঘ্রই এই বিলটির ওপর চূড়ান্ত ভোট গ্রহণ করা হবে।
এমন এক সময়ে এই বিস্ফোরক সংবাদ সামনে এল যখন পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দুই দেশের মধ্যে একটি অত্যন্ত নাজুক শান্তি আলোচনার খসড়া বিনিময় চলছে। তবে পর্দার আড়ালের এই কূটনৈতিক তৎপরতা খুব একটা আশাপ্রদ নয়। হোয়াইট হাউসের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আলোচনার টেবিলে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না এবং পরিস্থিতি বর্তমানে ‘অত্যন্ত গুরুতর’ পর্যায়ে রয়েছে। ওয়াশিংটন মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করার ওপর জোর দিচ্ছে এবং হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, আলোচনা ব্যর্থ হলে পুনরায় বিধ্বংসী বিমান হামলা বা বোমাবর্ষণের পথ বেছে নেবে পেন্টাগন।
ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, শান্তি চুক্তির জন্য আমেরিকা বেশ কিছু কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কোনো প্রকার যুদ্ধক্ষতিপূরণ না দেওয়া, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের (Uranium) মজুদ হস্তান্তর করা এবং ইরানের মাত্র একটি পারমাণবিক স্থাপনা সচল রাখা। এর বিপরীতে তেহরান তিনটি প্রধান শর্ত দিয়েছে— লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা, সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করা। যদিও বর্তমান সংকটের মাঝে আমেরিকা ইরানের ওপর থেকে তেল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করতে সম্মত হয়েছে, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের পথ দেখাতে পারছে না।
রণক্ষেত্রে ইরানের অভ্যন্তরীণ চিত্র এখন অত্যন্ত শোচনীয়। মার্কিন ও ইসরায়েলি লাগাতার হামলায় দেশটির প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত বিশাল সব ইস্পাত কারখানাগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এমন এক বিপর্যস্ত পরিস্থিতির মাঝে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ (Truth Social) প্ল্যাটফর্মে ইরানকে চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়ে লিখেছেন, “ইরান যদি দ্রুত আমাদের দেওয়া শর্তে চুক্তিতে না আসে, তবে মানচিত্র থেকে তাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে।”
একই সময়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জরুরি নিরাপত্তা বৈঠকের অজুহাতে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতি ও ফৌজদারি মামলার শুনানি থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। ট্রাম্পের সাথে ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ ফোনালাপের পর নেতানিয়াহুর এই রহস্যময় পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় ধরনের সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে, ইরান যেকোনো মুহূর্তে আগাম বা ‘প্রি-এম্পটিভ’ হামলা চালাতে পারে, যার ফলে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী এখন সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় (Red Alert) রয়েছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।